হরমুজ প্রণালিতে কড়াকড়ি ইরানের, জাহাজ চলাচল সীমিত—তেলের বাজারে অস্থিরতার শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz) দিয়ে জাহাজ চলাচলে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে ইরান। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৫টি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করতে পারবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪০টি জাহাজ চলাচল করে থাকে। নতুন বিধিনিষেধের ফলে এই সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে সরবরাহ সংকট এবং দামের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা তাস-এর বরাত দিয়ে ইন্ডিয়া টুডে (India Today) জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সরকারি সূত্র জানিয়েছে, এখন থেকে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণভাবে তেহরানের অনুমোদন এবং নির্দিষ্ট প্রটোকলের ওপর নির্ভর করবে। এই নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার তদারকি করবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি।

ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। মূলত গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ইরান এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি জাহাজকে আইআরজিসির কাছ থেকে আগাম অনুমতি নিতে হবে এবং নির্ধারিত ট্রানজিট ফি পরিশোধ করতে হবে।

জানা গেছে, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলাকালে প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য এক ডলার করে ফি আদায় করবে ইরান, যা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এই অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে ট্রানজিট ফি আদায়ের বিষয়ে ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে একটি ‘যৌথ উদ্যোগ’ বা জয়েন্ট ভেঞ্চারের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে, যা নতুন কূটনৈতিক জটিলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে এই জলপথে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে দ্রুত পরিকল্পনা জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা ইতোমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে—লেবাননে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে ইরান সাময়িকভাবে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল।

তেলের পাশাপাশি সার ও পেট্রোকেমিক্যালের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বাণিজ্যেও এই সীমাবদ্ধতার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।