মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz)-তে সমুদ্র মাইন ব্যবহারের আশঙ্কা নতুন করে বৈশ্বিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কম খরচে উচ্চ প্রভাব ফেলতে সক্ষম এই অস্ত্র সামান্য ব্যবহৃত হলেও বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স (Reuters) ও দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মাইন পাতা হতে পারে—এমন আশঙ্কাই ইতোমধ্যে জাহাজ চলাচল ও বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
সমুদ্রে কীভাবে বসানো হয় মাইন?
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সমুদ্র মাইন স্থাপন বা ‘মাইনলেইং’ একটি কৌশলগত ও বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া। সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো যুদ্ধজাহাজ থেকে নির্দিষ্ট রুট বা চোকপয়েন্টে সরাসরি মাইন ফেলে দেওয়া। এর পাশাপাশি ছোট নৌকা বা বেসামরিক জাহাজ ব্যবহার করে গোপনে মাইন বসানো হয়, যা ব্যস্ত নৌপথে সহজে শনাক্ত করা কঠিন।
আবার অনেক সময় সাবমেরিন ব্যবহার করে টর্পেডো টিউবের মাধ্যমে গভীর পানিতে মাইন স্থাপন করা হয়, যা বড় এলাকা জুড়ে মাইনফিল্ড তৈরি করতে সক্ষম। এমনকি বিমান বা হেলিকপ্টার থেকেও দ্রুত বৃহৎ এলাকায় মাইন ছড়িয়ে দেওয়া যায়, বিশেষ করে সংকীর্ণ জলপথ অবরুদ্ধ করতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো ব্যস্ত ও সংকীর্ণ নৌপথে এসব পদ্ধতির সমন্বিত ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে এবং অল্প সময়েই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
কীভাবে কাজ করে সমুদ্র মাইন?
সমুদ্র মাইন সাধারণত কয়েকভাবে সক্রিয় হয়। কন্ট্যাক্ট মাইন জাহাজের সঙ্গে সরাসরি ধাক্কা লাগলেই বিস্ফোরিত হয়। অন্যদিকে ইনফ্লুয়েন্স মাইন জাহাজের শব্দ, পানির চাপ বা চৌম্বকীয় পরিবর্তন শনাক্ত করে সক্রিয় হয়।
আরও উন্নত প্রযুক্তির ‘স্মার্ট মাইন’ নির্দিষ্ট জাহাজ শনাক্ত করতে পারে, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে, এমনকি নির্দিষ্ট সংখ্যক জাহাজ পার হওয়ার পর বিস্ফোরিত হওয়ার মতো সক্ষমতাও রাখে। ফলে এই ধরনের মাইন শুধু সামরিক নয়, বাণিজ্যিক জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, খুব অল্প সংখ্যক মাইন দিয়েই পুরো হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল করে দেওয়া সম্ভব। এমনকি মাইন থাকার গুজবই জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে, বীমা খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্থির করে তুলতে পারে।
মাইন অপসারণ কেন এত কঠিন?
সমুদ্র মাইন অপসারণ বা ‘মাইন ক্লিয়ারেন্স’ অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। সাধারণত মাইনসুইপিং পদ্ধতিতে বিশেষ জাহাজ ব্যবহার করে মাইন নিষ্ক্রিয় করা হয়। অন্যদিকে মাইনহান্টিং প্রযুক্তিতে উন্নত সোনার ব্যবহার করে একে একে মাইন শনাক্ত করা হয়।
এছাড়া রোবোটিক প্রযুক্তি, ডুবুরি কিংবা রিমোট ডিভাইসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়েও মাইন অপসারণ করা হয়। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হয়।
রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইতোমধ্যে ড্রোন ও রোবোটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই প্রস্তুতি জোরদার করেছে। তবুও পরিস্থিতি মোকাবিলা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সমুদ্র মাইন আধুনিক যুদ্ধের এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে এর সম্ভাব্য ব্যবহার শুধু সামরিক উত্তেজনাই বাড়াবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।


