জ্বালানি সংকট ও স্বাস্থ্যখাতের নাজেহাল চিত্র তুলে ধরলেন ডা. শফিকুর রহমান

জ্বালানি সংকটের বাস্তব চিত্র দেখতে পাম্প পরিদর্শন এবং হামে আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা জানতে রাজধানীর শিশু হাসপাতাল ঘুরে দেখেছেন বিরোধী দলের নেতা ও ডা. শফিকুর রহমান (Dr. Shafiqur Rahman)। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সংসদে সরকারি দলের মন্ত্রীরা এমনভাবে কথা বলেন যেন দেশে কোনো সংকটই নেই। অথচ মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা যায়, সমস্যার স্তূপ জমে আছে সর্বত্র।

হাসপাতালের পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াতের আমীর বলেন, ১৯৭২ সালে মাত্র ৫০টি শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি এখন ৭০০ বেডে উন্নীত হলেও রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জটিল রোগী রেফার হয়ে আসায় অনেক ক্ষেত্রেই রোগীদের ভর্তি নিতে না পেরে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। তিনি জানান, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা সন্তোষজনক হলেও অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট অত্যন্ত প্রকট।

বিশেষ করে নবজাতকদের জন্য আইসিইউ সুবিধা থাকলেও এমআরআই কিংবা সিটি স্ক্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় গুরুতর অসুস্থ শিশুদের বাইরে পাঠাতে হয়। এতে করে ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও ব্যাহত হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারি অনুদান কমানো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আগে যেখানে বছরে ৩০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হতো, সেখানে গত বছর তা কমিয়ে ২৮ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। বাজেট বাড়তে থাকলেও স্বাস্থ্যখাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ কমানোর যুক্তি কী—সেই প্রশ্ন তুলেন তিনি। পাশাপাশি সংসদে এ বিষয়ে কথা বলার আশ্বাস দেন।

দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যখাতের চিত্র নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, পুরো খাতটি এখন এক ধরনের “ডিজেস্টার”-এ পরিণত হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (Mymensingh Medical College Hospital) পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১০০০ বেডের বিপরীতে সেখানে ৩০০০ থেকে ৩৭০০ রোগী ভর্তি থাকে। পর্যাপ্ত জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এই দুই খাতেই দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

পরিদর্শনের সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি ‘ব্রঙ্কোস্কোপ’ যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা জানালে সেটি সরবরাহের চেষ্টা করবেন বলে জানান জামায়াত আমীর। তিনি বলেন, শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ, তাই তাদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি থাকা উচিত নয়। রাজনীতি শুধু সরকারি অর্থ ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ব্যক্তিগত উদ্যোগেও জনগণের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

হামে আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, হাসপাতালের শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুরবস্থারই প্রতিফলন। তার ভাষায়, হাসপাতালগুলো এখন আর সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এক ধরনের ‘বাজার’-এ পরিণত হয়েছে।

সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, অনেক পরিকল্পনা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সংসদে এসব বিষয় উত্থাপনের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, দেশের সংকটময় বাস্তবতা তুলে ধরা জরুরি। অথচ সংসদে সরকারি দলের বক্তব্য শুনলে মনে হয় সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে—যা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

এদিকে সকালে সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন (Sonar Bangla Filling Station) পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও তা নিয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, আগে যেখানে একটি পাম্প তিন গাড়ি তেল পেত, এখন পাচ্ছে মাত্র এক গাড়ি। অর্থাৎ চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করা হচ্ছে, যা সংকটকে আরও তীব্র করছে।

সংসদ সদস্যদের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দাঁড়িয়ে বাস্তবতা আড়াল করা ঠিক নয়। জ্বালানি সংকট বৈশ্বিক হলেও তা নিয়ে সরকারের লুকোচুরি জনগণের জন্য আরও বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।