ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাণিজ্যে যে গভীর পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, তার অন্যতম দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে উঠেছে পানামা খাল (Panama Canal)। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জরুরি পণ্য পরিবহনে এই খাল ব্যবহারের হার কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দ্রুত খাল পার হতে আকাশচুম্বী খরচ করতেও পিছপা হচ্ছে না জাহাজগুলো। একই সময়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মালাক্কা প্রণালি—যেখানে জাহাজ চলাচলে টোল আরোপের প্রস্তাব তুলেছে ইন্দোনেশিয়া (Indonesia)।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো (Prabowo Subianto)-এর নির্দেশনার প্রসঙ্গ টেনে দেশটির অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া বলেন, ইন্দোনেশিয়া আর নিজেদের প্রান্তিক অবস্থানে দেখতে চায় না। তার ভাষায়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের কৌশলগত রুটে অবস্থান করেও মালাক্কা প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে কোনো শুল্ক না নেওয়া একটি অদ্ভুত বাস্তবতা। এই প্রস্তাবের অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি ইরানের হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, ইরানের মতো ইন্দোনেশিয়াও এই শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।
তবে বাস্তবতা যে সহজ নয়, সেটিও স্বীকার করেছেন তিনি। মালাক্কা প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এককভাবে ইন্দোনেশিয়ার হাতে নেই—এটি মালয়েশিয়া (Malaysia) ও সিংগাপুর (Singapore)-এর সঙ্গে ভাগাভাগি করা। ফলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হলে আঞ্চলিক ঐকমত্য অপরিহার্য। পুরবায়ার মতে, “সম্পদ থাকা সত্ত্বেও রক্ষণাত্মক মনোভাব ধরে রাখলে চলবে না, আমাদের আক্রমণাত্মকভাবে চিন্তা করতে হবে।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাণিজ্যের চিত্র বদলে যেতে শুরু করে। বিশ্বের প্রধান বাণিজ্যিক ধমনি হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় নৌপথে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, ফলে এশিয়ার শোধনাগারগুলো বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। এখন তারা উপসাগরীয় দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়াচ্ছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে পানামা খাল। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা এই রুট এখন জ্বালানি পরিবহনের প্রধান ভরসা। পানামা খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্প্রতি একটি এলএনজি জাহাজ ৪০ লাখ ডলার ব্যয় করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাল পার হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে পাঁচ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে এখন সময় বাঁচাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতেও দ্বিধা করছে না কোম্পানিগুলো।
যুদ্ধের পর থেকে এমন ‘লাইন এড়ানোর’ পেমেন্টের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে খাল কর্তৃপক্ষ। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামে অস্থিরতা বাড়ানোর অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে মালাক্কা প্রণালিতে টোল আরোপের প্রস্তাব আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী এই ধারণাকে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের বলে উল্লেখ করলেও, এটি বাস্তবায়নের আগে আঞ্চলিক সমন্বয় ও বৈশ্বিক প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণের ওপর জোর দিয়েছেন।
তবে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে সিংগাপুর ও মালয়েশিয়া। সিংগাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মালাক্কা ও সিংগাপুর প্রণালির নৌপথ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে। তার মতে, এটি কোনো বিশেষ সুবিধা নয় যে এর জন্য আলাদা করে টোল দিতে হবে—এটি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের অধিকার, যা জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন দ্বারা স্বীকৃত।
একই সুর শোনা গেছে মালয়েশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী অ্যান্থনি লোকের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, মালাক্কা প্রণালিতে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তাদের দেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ক্ষেত্রেও তারা অঙ্গীকারবদ্ধ।
সব মিলিয়ে হরমুজ সংকট বিশ্ববাণিজ্যের রুট, ব্যয় এবং কৌশল—সবকিছুকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। পানামা খালের ওপর চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি মালাক্কা প্রণালিকে ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনও ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে।


