জ্বালানির ধাক্কায় নিত্যপণ্যে ঊর্ধ্বগতি, বাজারে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন ক্রেতারা

বাজারে ঢুকেই যেন বাস্তবতার ধাক্কা খেলেন ফরহাদ হোসেন। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে এক ডজন ডিমের দাম ১৫ টাকা বেড়ে গেছে। তিনি নিয়মিত যে মাঝারি মানের চাল—পাইজাম—কিনে থাকেন, সেটিও আর আগের দামে নেই; প্রতি কেজিতে বেড়েছে ৫ টাকা। শুধু ডিম আর চালেই থেমে নেই এই ঊর্ধ্বগতি—আটা, ময়দা, তেল, ডাল থেকে শুরু করে সবজির ঝুড়ি পর্যন্ত সবকিছুর দামই ঊর্ধ্বমুখী।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাওরান বাজার, শান্তিনগর এবং তুরাগের নতুন বাজার ঘুরে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। আয় অপরিবর্তিত থাকায় এই বাড়তি ব্যয় এখন তাদের দৈনন্দিন জীবনের হিসাবকেই এলোমেলো করে দিচ্ছে।

গত ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে। একই মাসে দ্বিতীয়বারের মতো ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজির দামও বাড়ানো হয়। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রথম আঘাত লাগে পরিবহন খাতে। সরকারিভাবে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের আগেই বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রাক ভাড়া এক লাফে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এর প্রভাব দ্রুতই পাইকারি বাজারে পড়ে, যা এখন ধীরে ধীরে খুচরা পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি একটি ‘চেইন প্রভাব’ তৈরি করে। উৎপাদন থেকে পরিবহন—প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়ে, আর শেষ পর্যন্ত তা মূল্যস্ফীতির চাপ হয়ে ভোক্তার ঘাড়ে এসে পড়ে। তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, এই উচ্চ জ্বালানি ব্যয় দীর্ঘস্থায়ী হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।

চালের দামে নতুন চাপ
বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, মাঝারি মানের চাল—পাইজাম বা লতা—গত তিন দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে দুই থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে। তিন দিন আগেও ৫৫ থেকে ৬৮ টাকায় বিক্রি হওয়া চাল এখন ৬০ থেকে ৭০ টাকায় উঠেছে। একইভাবে আটা ও ময়দার দামও কেজিপ্রতি দুই থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে। খোলা আটা এখন ৪২ থেকে ৪৬ টাকা, প্যাকেট আটা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং খোলা ময়দা ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

খোলা সয়াবিন তেলের দামও লিটারপ্রতি ৫ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকায়। ছোলা, ডিম ও সবজির দামও একই সময়ে বেড়েছে। ছোলা এখন ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েকদিন আগেও ছিল ৮০ থেকে ৯৫ টাকা। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ফার্মের ডিমের দাম—এক সপ্তাহে ১২০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ১৩৫ টাকা।

সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (Trading Corporation of Bangladesh)-এর দৈনিক প্রতিবেদনে এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির তথ্যও উঠে এসেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির (Khandaker Abdul Muktadir) জানিয়েছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। সরকার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং কোনো কৃত্রিম সংকট বা কারসাজি সহ্য করা হবে না।

সবজির বাজারেও আগুন
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সবজির বাজারেও প্রভাব পড়েছে। বেশির ভাগ সবজির কেজি এখন ৭০ টাকার ওপরে। বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা, ঝিঙা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, পটল ৮০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা এবং কচুমুখী ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বেচাকেনায় মন্দা
দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে বাজারের বেচাকেনাতেও। তুরাগ এলাকার নতুন বাজারের এক ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী সাদ্দাম হোসেন জানান, গত কয়েক দিনে বিক্রি কমে গেছে, ক্রেতাদের আনাগোনাও কমেছে। একই অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন ক্রেতা ফরহাদ হোসেন—যিনি বলেন, সব পণ্যের দাম বাড়লেও তাদের আয় একই রয়ে গেছে, ফলে সংসারের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, জ্বালানির সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। এই মুহূর্তে বোরো মৌসুম চলমান থাকায় কৃষিতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (Consumers Association of Bangladesh)-এর সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে পণ্যের দাম বাড়বে, সেটি স্বাভাবিক; তবে কতটা বাড়ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, অনেক ব্যবসায়ী সুযোগ পেলে দাম বাড়াতে দ্বিধা করেন না।

তিনি আরও বলেন, বাজার তদারকিতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সক্রিয়তা এখন খুব একটা দৃশ্যমান নয়। অথচ এই সংস্থার নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমেই বাজারকে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব।