পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি দেশে ফিরিয়ে এনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই জটিল অভিযানে চলতি বছরের ৩০ মার্চ এমটিএফই (মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ গ্রুপ) নামের প্রতারণামূলক অনলাইন বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাচার হওয়া প্রায় ৪৪ কোটিরও বেশি টাকার সমমূল্যের ডিজিটাল মুদ্রা উদ্ধার করা হয়।
অপরাধ তদন্ত বিভাগ (Criminal Investigation Department)-এর বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এই অর্জন শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস (U.S. Embassy Dhaka) তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বের একটি ইতিবাচক ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করেছে।
একইসঙ্গে ইউএস সিক্রেট সার্ভিস (U.S. Secret Service) তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এই সাফল্য প্রকাশ করে জানায়, সিআইডির সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ ও সমন্বিত সহযোগিতার ফলেই এমন সাফল্য সম্ভব হয়েছে।
সিপিসির ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার এ বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের কর্মকর্তাদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতার ফলে এই প্রথম বিদেশে পাচার হওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।’ তার মতে, এটি সাইবার অপরাধ দমনে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে এ সাফল্যের খবর প্রকাশের পর দেশ-বিদেশে যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা সংশ্লিষ্টদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতে আরও দৃঢ়ভাবে দায়িত্ব পালনের পথ তৈরি করছে।
প্রতারণার জাল: এমটিএফইর কৌশল
এমটিএফই ছিল একটি ভুয়া ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফরেক্স ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বিনিয়োগকারীদের কৃত্রিম লাভের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ লগ্নিতে উৎসাহিত করা হতো। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্ল্যাটফর্মটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, আর সেই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের অর্থ বিভিন্ন ক্রিপ্টো ওয়ালেটে পাচার করা হয়।
তদন্তে সিআইডি প্রায় ৩.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ইউএসডিটি শনাক্ত করে, যা আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জে ছড়িয়ে ছিল। উন্নত ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই অর্থ জব্দ করা সম্ভব হয়। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশনায় এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় অর্থ বৈধ মুদ্রায় রূপান্তর করে সোনালী ব্যাংক (Sonali Bank)-এর সরকারি হিসাবে জমা দেওয়া হয়েছে।
এই পুরো প্রক্রিয়া সিআইডির পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার এক শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাও আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিপিসি ইউনিট। অপরাধের পূর্ণাঙ্গ চিত্র উন্মোচন এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। খুব শিগগিরই প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের মধ্যে অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সূত্র: বাসস
