বহু প্রতীক্ষার পর দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র (Rooppur Nuclear Power Plant)-এর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটি চালু হওয়ার আগেই ব্যয় ও অনিয়ম নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় এই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ, এমনকি ইউরোপের বহু দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়েও বেশি। ফলে এটি ভবিষ্যতে দেশের জন্য অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, রূপপুর প্রকল্পটি শুরু থেকেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত। ‘বালিশকাণ্ড’ থেকে শুরু করে একাধিক বিতর্কিত ব্যয়ের ঘটনা এই প্রকল্পকে ঘিরে জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) এবং তার পরিবারের সদস্য, যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত টিউলিপ সিদ্দিকী (Tulip Siddiq)-এর বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগটি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদার রোসাটম (Rosatom)-এর সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে, যা ১২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। অথচ অন্যান্য দেশে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয় গড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের কম। ফলে এই বিপুল ব্যয় এখন পুরো জাতির ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে বিতরণ করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (Bangladesh Power Development Board – PDB)। সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রকল্পের ব্যয় সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সহজে সরবরাহ করছে না রোসাটম, যা স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করছে।
পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, এখনো রূপপুরের বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে এবং সেগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (Transparency International Bangladesh – TIB)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, রূপপুর প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমে টিউলিপ সিদ্দিকীর সম্পৃক্ততার বিষয়ও উঠে এসেছে। তার মতে, বর্তমান সরকারের উচিত এই প্রকল্প নিয়ে গভীর অনুসন্ধান করা, কারণ প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি প্রায়শই দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে।
তিনি আরও বলেন, “অনেক প্রকল্পের মতো রূপপুরেও ব্যয় বাড়িয়ে সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা থাকতে পারে। তাই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।” সংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ আমলের বড় দুর্নীতির উদাহরণ হিসেবে রূপপুর প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে, এবং সঠিক তদন্ত হলে আরও বড় অনিয়মের তথ্য সামনে আসতে পারে।
এদিকে মঙ্গলবার রূপপুর কেন্দ্রের একটি ইউনিটে জ্বালানি লোড করা হয়েছে। এর ফলে আগামী আগস্ট থেকে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ব্যয়ের তুলনায় রূপপুর কেন ব্যতিক্রম
ভারতের তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলায় নির্মাণাধীন কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে রূপপুরের ব্যয়ের তুলনা করলে বড় পার্থক্য চোখে পড়ে। একই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সহযোগিতায় নির্মিত হলেও ব্যয়ের ব্যবধান উল্লেখযোগ্য।
গবেষণায় দেখা গেছে, রূপপুরে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাব্য খরচ ৯ দশমিক ৩৬ সেন্ট, যেখানে ভারতের কুদানকুলামে তা ৫ দশমিক ৩৬ সেন্ট। অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি ব্যয় হচ্ছে রূপপুরে। এই হিসাব করা হয়েছে ‘লেভেলাইজড কস্ট অব এনার্জি (LCOE)’ পদ্ধতিতে।
বিশ্ব পরমাণু সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর প্রকল্পের মূলধনি ব্যয় ১ হাজার ২৬৫ কোটি ডলার। অন্যদিকে ভারতের কুদানকুলামের দুটি ইউনিটে ব্যয় ৬২৫ কোটি ডলার। ফলে রূপপুরে প্রতি কিলোওয়াট নির্মাণ ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৫ হাজার ২৭১ ডলার, যেখানে ভারতে তা ৩ হাজার ১২৫ ডলার।
শুধু এশিয়াতেই নয়, ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায়ও রূপপুরের ব্যয় বেশি। বিভিন্ন দেশের তথ্য অনুযায়ী, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রতি ইউনিট ব্যয় ১ হাজার ৫৫৬ থেকে ৫ হাজার ৮১ ডলারের মধ্যে থাকে। অথচ রূপপুরে এই ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৮৯০ ডলার।
রাশিয়ার নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত কেন্দ্রেও ব্যয় তুলনামূলক কম। উদাহরণ হিসেবে ফিনল্যান্ডে নির্মাণাধীন একটি কেন্দ্রের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ বিলিয়ন ডলার, যেখানে ইউনিটপ্রতি ব্যয় ৫ হাজার ডলার। আবার তুরস্কের আক্কুইউ প্রকল্পে প্রতি ইউনিট ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ২০০ ডলার।
ঋণনির্ভর প্রকল্প, বাড়ছে দায়
প্রাথমিকভাবে রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ২৬৫ কোটি ডলার, যার ৯০ শতাংশ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া এবং বাকি ১০ শতাংশ বহন করছে বাংলাদেশ সরকার। শুরুর দিকে সমীক্ষা, ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত কাজে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি ডলার।
এই ব্যয়গুলো যুক্ত করলে মোট প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। ফলে এই প্রকল্পের আর্থিক দায় দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
