রূপপুর ঘিরে ঈশ্বরদীর রূপান্তর—প্রযুক্তি, অর্থনীতি আর জীবনের নতুন অধ্যায়

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (Rooppur Nuclear Power Plant) ঘিরে গত এক দশকে ঈশ্বরদী (Ishwardi)-র আর্থ-সামাজিক অবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। একসময় যেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছিল সীমিত ও ধীরগতির, সেখানে এখন চোখে পড়ে আধুনিক সড়কব্যবস্থা, উন্নত আবাসন, বিস্তৃত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক মানের নানা সুযোগ-সুবিধা। এই পরিবর্তন যেন একটি জনপদের চেহারাই পাল্টে দিয়েছে।

প্রকল্পের শুরু থেকেই এখানে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের, বিশেষ করে রুশ বিশেষজ্ঞদের বসবাসের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে একটি আধুনিক আবাসন এলাকা, যা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘রাশিয়ান পল্লী’ নামে। এই আবাসনকে ঘিরেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে রেস্তোরাঁ, শপিংমল, বিনোদনকেন্দ্রসহ নানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। স্থানীয়দের অনেকেই এখন মজা করেই বলেন, ঈশ্বরদী যেন ‘এক টুকরো রাশিয়া’ হয়ে উঠেছে।

এই পরিবর্তন কেবল অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রা, চিন্তাভাবনা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও। আগে যেখানে কাজের সুযোগ ছিল অল্প, এখন সেখানে হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন খাতে যুক্ত হয়ে নিজেদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পেরেছেন।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও রূপপুর প্রকল্প নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে সচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। রূপপুর প্রকল্পের পারমাণবিক তথ্যকেন্দ্রের উদ্যোগে ঈশ্বরদী উপজেলার ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ কর্মসূচি। এসব আয়োজনে ‘পরমাণু কী’, ‘জ্বালানি কীভাবে তৈরি হয়’ এবং ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাব’সহ নানা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ বাড়ছে, পাশাপাশি তারা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

ঈশ্বরদী মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ ইসমাইল হোসেন বলেন, রূপপুর প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সূচনা। তিনি জানান, এখানে ব্যবহৃত VVER-1200 প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ নিতে ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষার্থী ও প্রকৌশলী রাশিয়া গেছেন, যা দেশে পারমাণবিক প্রকৌশল শিক্ষার একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলছে।

জীবনমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার দিক থেকেও প্রকল্পটির প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট। প্রকল্প এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধুনিক আবাসন এবং আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক অবকাঠামো। বিশেষ করে গ্রিনসিটি এলাকা এখন আধুনিক নগরায়ণের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গ্রিনসিটি ও আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা হোটেল, রেস্তোরাঁ ও শপিংমল স্থানীয় অর্থনীতিতে এনেছে নতুন গতি। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন স্থানীয় তরুণ-তরুণীরা, যারা বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নতুন দক্ষতা অর্জন করছেন। অনেকেই রুশ ভাষা শিখে নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলেছেন।

গ্রিনসিটির একটি ক্যাফের কর্মী মমিনুল ইসলাম জানান, গত পাঁচ বছর ধরে কাজ করতে গিয়ে তিনি রুশ নাগরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের ভাষায় কথোপকথনে দক্ষ হয়ে উঠেছেন। তার মতে, এই প্রকল্প তাকে শুধু একটি চাকরিই দেয়নি, দিয়েছে নতুন একটি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রোসাটম (Rosatom)-এর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে যুক্ত রয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার রুশ বিশেষজ্ঞ। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধীনে প্রায় ১৬ হাজার শ্রমিক ও কর্মী বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত আছেন। এই বিপুল কর্মসংস্থান স্থানীয় অর্থনীতিকে করেছে আরও প্রাণবন্ত। ঈশ্বরদী ও আশপাশের অঞ্চল এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

পরিবহন, আবাসন, খাদ্য সরবরাহ ও খুচরা ব্যবসাসহ প্রায় সব খাতেই বেড়েছে চাহিদা ও বিনিয়োগ। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, প্রকল্পের কারণে তাদের ব্যবসার পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় প্রতিযোগিতা বাড়লেও সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এসেছে ইতিবাচক গতি।

সব মিলিয়ে, রূপপুরের হাত ধরে বদলে যাওয়া ঈশ্বরদী এখন আর শুধু একটি জনপদ নয়; এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নযাত্রার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।