সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থীদের বড় অংশই উচ্চশিক্ষিত এবং কোটিপতি—এমনই তথ্য উঠে এসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (Transparency International Bangladesh – TIB)-এর বিশ্লেষণে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এর প্রার্থীদের হলফনামা ঘেঁটে এই তথ্য তুলে ধরেছে সংস্থাটি।
টিআইবি জানিয়েছে, মনোনীতদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই উচ্চশিক্ষিত এবং একইসঙ্গে কোটিপতি। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রার্থী কোটিপতি, আর ৬৩ শতাংশের বেশি প্রার্থী স্নাতকোত্তর বা তারও বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করেছেন। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীরা সাধারণ আসনের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন। সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে যেখানে স্নাতকোত্তর বা তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারীর হার ৫০.৭ শতাংশ, সেখানে সংরক্ষিত নারী আসনে এই হার ৬৩.৩ শতাংশ। সার্বিকভাবে, নির্বাচিত ও সংরক্ষিত মিলিয়ে সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৫২.৬৩ শতাংশই স্নাতকোত্তর বা তার বেশি শিক্ষিত। এছাড়া সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের মধ্যে ২৭ শতাংশ স্নাতক, ৪.১ শতাংশ উচ্চমাধ্যমিক পাশ, ৪.১ শতাংশ স্বশিক্ষিত এবং ২.১ শতাংশ মাধ্যমিক পাশ।
অন্যদিকে সম্পদের দিক থেকেও প্রার্থীদের বড় অংশই বিত্তবান। মোট ৪৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জনই কোটিপতি, যা প্রায় ৬৫.৩১ শতাংশ। অস্থাবর সম্পদের হিসেবে ২৫ জন এবং স্থাবর সম্পদের হিসেবে ১৪ জন কোটিপতি। দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP)-এর ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৬ জনই কোটিপতি, আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami Bangladesh)-এর ৯ জনের মধ্যে ৫ জন কোটিপতি। জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (JAGPA)-এর একমাত্র প্রার্থীও কোটিপতি।
গড় বার্ষিক আয় ১০ লাখ টাকার বেশি—এমন প্রার্থীর হার ৩৮.৭৮ শতাংশ। তবে সাধারণ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে এই হার ৬৭.৯ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে ত্রয়োদশ সংসদে সরাসরি ও সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে কোটিপতি সদস্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬৯ জন, যা মোটের ৭৭.৩ শতাংশ।
পেশাগত দিক থেকে বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের মধ্যে আইনজীবীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—২৬.৫ শতাংশ, যা সাধারণ আসনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্যবসায়ী (২২.৫ শতাংশ)। এছাড়া গৃহিণী ১২.২ শতাংশ, শিক্ষক ১০.২ শতাংশ, সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত ৮.২ শতাংশ প্রার্থী রয়েছেন। চিকিৎসক এবং অন্যান্য পেশাজীবী—দুই ক্ষেত্রেই হার ৪.১ শতাংশ। সার্বিকভাবে সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৫৫.১৭ শতাংশই ব্যবসায়ী।
নারী প্রার্থীদের সম্পদ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কোটিপতিদের স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৬৬ কোটি টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৭৮ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫২ কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্যভাবে অন্তত তিনজন প্রার্থীর কাছে ১০০ ভরির বেশি স্বর্ণালংকার রয়েছে, যার মধ্যে একজনের নিজের নামেই রয়েছে ৫০২ ভরি স্বর্ণ।
এত সম্পদের পাশাপাশি ঋণের চিত্রও উঠে এসেছে বিশ্লেষণে। দেখা যায়, ২০.৪১ শতাংশ প্রার্থী কোনো না কোনোভাবে ঋণগ্রস্ত। দলীয়ভাবে বিএনপি ও জামায়াতের ক্ষেত্রে এই হার সমান—২২.২২ শতাংশ। তবে সাধারণ আসনের সংসদ সদস্যদের মধ্যে ঋণগ্রস্ততার হার ৫০.৮৪ শতাংশ, যা সংরক্ষিত আসনের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি।
বয়সের দিক থেকে প্রার্থীদের গড় বয়স ৫২.১৭ বছর। সবচেয়ে বেশি প্রার্থী রয়েছেন ৪৫-৫৪ বছর বয়সসীমায়। দলভিত্তিক বণ্টনে বিএনপির ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এই বয়সসীমায়, অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। সার্বিকভাবে সংসদ সদস্যদের গড় বয়স ৫৮.৫ বছর।
সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০টি পদের মধ্যে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে ৩৬ জনকে, যা সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী (৯ জন)। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP), খেলাফত মজলিস ও স্বতন্ত্রসহ অন্যান্য দল থেকে একজন করে প্রার্থী মনোনীত হয়েছেন। মোট প্রার্থীর মধ্যে ২০.৪ শতাংশ ইসলামী দলের এবং ৭৯.৬ শতাংশ অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র।
হলফনামা বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে নারী প্রার্থীদের সম্পদ তাদের স্বামীদের তুলনায় কম হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উল্টো চিত্র দেখা যায়। এই বৈষম্য দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
টিআইবি মনে করে, সংরক্ষিত নারী আসনে উচ্চশিক্ষিত ও বিভিন্ন পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ ইতিবাচক হলেও সম্পদের প্রভাব এবং নির্দিষ্ট পেশার আধিপত্য ভবিষ্যতে রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
