উৎপাদন ব্যয় বেড়ে চাপে বিদ্যুৎ খাত, পাইকারিতে ২১% পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

দেশের জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব সামনে এসেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (Bangladesh Energy Regulatory Commission)-এ জমা পড়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ (Jalal Ahmed) এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পিডিবির পক্ষ থেকে প্রস্তাব এলেও বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব এখনো জমা পড়েনি। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে আরও সময় লাগবে।

বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবগুলো প্রথমে কারিগরি কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপর গণশুনানির আয়োজন করা হবে, যেখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তাদের মতামত তুলে ধরতে পারবে। তবে সামনে ঈদের ছুটি থাকায় অন্তত এক মাসের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা নেই।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ইউনিটের মূল্য দাঁড়িয়েছিল ৭.০৪ টাকা। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে প্রতি ইউনিটে আরও ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

পিডিবির প্রস্তাবে মূল্য বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রথমত, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বড় প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা সরাসরি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলছে।

দ্বিতীয়ত, বিশাল আর্থিক ঘাটতির বিষয়টি সামনে এসেছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান দামে বিদ্যুৎ বিক্রি অব্যাহত থাকলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি, তেল ও কয়লা আমদানি করতে হওয়ায় এই চাপ আরও বাড়ছে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (IMF) বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমিয়ে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। সরকারের মতে, এই সুপারিশ বাস্তবায়ন না করলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পাইকারি দাম বাড়লে এর প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়েও পড়বে। যদিও পিডিবি তাদের প্রস্তাবে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী ‘লাইফলাইন’ গ্রাহকদের জন্য দাম অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করেছে। তবে আবাসিক ক্ষেত্রে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতের জন্যও নতুন ট্যারিফ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

মন্ত্রণালয়ের যুক্তি অনুযায়ী, বিশ্ববাজারের অস্থিরতার মধ্যেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka) এবং সিঙ্গাপুর (Singapore)-এর মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে মূল্য সমন্বয়ের পথে হেঁটেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভর্তুকির বোঝা কমানো এবং সরবরাহ সচল রাখতে এই মূল্য বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

তবে শেষ পর্যন্ত এই প্রস্তাব কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে গণশুনানি এবং বিইআরসির চূড়ান্ত মূল্যায়নের ওপর।