সৌদির চাপে দেড় দিনেই থেমে গেল ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’

ইরানের অবরোধ ভেঙে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। তবে উপসাগরীয় মিত্রদের তীব্র প্রতিক্রিয়া, বিশেষ করে সৌদি আরবের কঠোর অবস্থানের মুখে মাত্র দেড় দিনের মধ্যেই সেই পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে ওয়াশিংটন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ কূটনৈতিক ও সামরিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, গত রোববার সামাজিক মাধ্যমে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে এই উদ্যোগের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এর উদ্দেশ্য ছিল ইরানের হুমকি ও সম্ভাব্য হামলার মধ্যেও পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ও নজরদারি ব্যবস্থা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিত। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজকে নিরাপদে প্রণালি অতিক্রম করাতেও সক্ষম হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু ঘোষণার পরপরই সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশ ক্ষোভ প্রকাশ করে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ট্রাম্পের একতরফা ঘোষণায় সৌদি নেতৃত্ব বিস্মিত ও অসন্তুষ্ট হয়েছিল।

এরপর রিয়াদ সরাসরি ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দেয়, তারা আর যুক্তরাষ্ট্রকে সৌদির প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে দেবে না। একইসঙ্গে সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করে সামরিক অভিযান চালানোর অনুমতিও প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দেয় দেশটি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাম্প সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (Mohammed bin Salman)-এর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তবে সেই আলোচনাতেও অচলাবস্থা কাটেনি। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক মিত্রদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যুদ্ধবিমান, জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ এবং সহায়ক বিমানের কার্যক্রমের জন্য এই সহযোগিতার বিকল্প কার্যত নেই।

এদিকে কাতার, ওমানসহ আরও কয়েকটি উপসাগরীয় দেশও অভিযোগ তুলেছে, অভিযানের ঘোষণা দেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত সমন্বয় করা হয়নি।

এক মধ্যপ্রাচ্যীয় কূটনীতিক জানিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণার পরই যুক্তরাষ্ট্র ওমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। যদিও ওমান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করেনি।

অন্যদিকে হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, আঞ্চলিক মিত্রদের আগেই অবহিত করা হয়েছিল।

‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিতের পর ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য একটি সমঝোতার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তিনি সাময়িক বিরতি দিয়েছেন। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, তারা নতুন একটি শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে। পাকিস্তান এই মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

বুধবার ট্রাম্প বলেন, “গত ২৪ ঘণ্টায় খুব ভালো আলোচনা হয়েছে এবং ইরান সমঝোতায় আগ্রহী।” তবে একইসঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারও ইরানে ব্যাপক বোমা হামলা চালানো হতে পারে।

মূলত আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। রিপাবলিকান পার্টির একটি অংশ চাইছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত রাখা হোক।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)-এর সঙ্গে বৈঠকের জন্য আগামী সপ্তাহে বেইজিং সফরের আগেই ইরান সংকটের একটি সমাধান চান ট্রাম্প।

এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের জ্যেষ্ঠ সদস্য এব্রাহিম রেজায়ি (Ebrahim Rezaei) বলেছেন, “যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না, যা তারা আলোচনায় পায়নি।”

তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রয়োজন হলে ইরান কঠোর জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

তবে জর্ডানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।