মা—একটি শব্দ, এক অনন্ত আশ্রয়; ভালোবাসা যার কোনো নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে বাঁধা নয়

মা—পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর, পবিত্র ও নির্ভরতার নাম। জন্মের পর থেকে জীবনের প্রতিটি ধাপে একজন মা নিঃস্বার্থভাবে সন্তানের জন্য বিলিয়ে দেন ভালোবাসা, স্নেহ, ত্যাগ আর অফুরন্ত মমতা। তাই মাকে ভালোবাসা জানানোর জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না। তারপরও পৃথিবীর নানা দেশে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিশেষ দিন হিসেবে পালিত হয় ‘মা দিবস’। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার এই দিবস পালন করা হয়। ২০২৬ সালে দিনটি এসেছে ১০ মে।

মা দিবসে সন্তানেরা নানা উপায়ে মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেন। কেউ ফুল উপহার দেন, কেউ শুভেচ্ছা কার্ড কিংবা প্রিয় কোনো উপহার। আবার কেউ শুধু মায়ের পাশে বসে কিছুটা সময় কাটিয়েই অনুভব করেন সবচেয়ে বড় শান্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এদিন ভরে ওঠে মা ও সন্তানের ছবি, স্মৃতিচারণ আর আবেগঘন লেখায়। একটি বাক্য—“মা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি”—অনেকের কাছেই যেন হয়ে ওঠে সবচেয়ে গভীর প্রকাশ।

তবে অনেকেই মনে করেন, মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আনুষ্ঠানিকতারও প্রয়োজন নেই। তারপরও মা দিবস মানুষকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—মায়ের প্রতি দায়িত্ব, যত্ন আর কৃতজ্ঞতার কথা।

আধুনিক মা দিবসের প্রচলন শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র (United States)-এ। দিবসটির প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত আনা মারিয়া রিভস জার্ভিস (Anna Jarvis)। তাঁর মা অ্যান মারিয়া রিভস জার্ভিস ছিলেন সমাজকর্মী ও শান্তিবাদী একজন নারী। তিনি ‘মাদারস ডে ওয়ার্ক ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করে সমাজসেবামূলক নানা কাজ করতেন। ১৯০৫ সালে মায়ের মৃত্যু হলে আনা তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। তিনি চেয়েছিলেন, পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিন থাকুক।

১৯০৮ সালে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার একটি গির্জায় মায়ের স্মরণে প্রথম আনুষ্ঠানিক মা দিবস পালন করেন আনা। ধীরে ধীরে দিবসটি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson) মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশসহ শতাধিক দেশে বর্তমানে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস পালিত হয়। যদিও সব দেশে একই দিনে দিবসটি উদযাপিত হয় না। যুক্তরাজ্যে ‘মাদারিং সানডে’, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে ২১ মার্চ, আবার রাশিয়াসহ কিছু দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সঙ্গে মা দিবসও পালন করা হয়। থাইল্যান্ডে রানীর জন্মদিনকে মা দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়।

বাংলাদেশেও দিবসটি এখন ব্যাপকভাবে পালিত হয়। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজন করে। রেস্টুরেন্ট, গিফট শপ ও ফ্যাশন হাউসগুলো দেয় বিশেষ অফার। সন্তানরা মায়ের সঙ্গে সময় কাটান, উপহার দেন, ফোন করে খোঁজ নেন। তবে এই আয়োজনের মূল বার্তা একটাই—মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও ত্যাগকে সম্মান জানানো।

মাকে নিয়ে পৃথিবীর প্রায় সব ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অগণিত কবিতা, গান ও গল্প রচিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যেও মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগের অনন্য প্রকাশ দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore)-এর ‘মনে পড়া’, শামসুর রাহমানের ‘কখনো আমার মাকে’, হুমায়ুন আজাদের ‘আমাদের মা’ কিংবা আল মাহমুদের ‘নোলক’—সবখানেই মা উঠে এসেছেন গভীর আবেগ আর মমতার প্রতীক হয়ে।

শুধু মানুষের মধ্যেই নয়, প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও মাতৃত্বের বিস্ময়কর উদাহরণ দেখা যায়। প্রাণিজগতে মাকড়সাকে অনেক সময় ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা’ বলা হয়। কারণ মা মাকড়সা নিজের ডিম বহন করে এবং সন্তান জন্মের পর তাদের বাঁচিয়ে রাখতে নিজের শরীর পর্যন্ত খাদ্য হিসেবে বিলিয়ে দেয়। সন্তানের জন্য এই আত্মত্যাগ মাতৃত্বের এক অনন্য নিদর্শন।

পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় ‘মা’ শব্দের উচ্চারণেও রয়েছে আশ্চর্য মিল। বাংলা ভাষায় ‘মা’, ইংরেজিতে ‘মম’ বা ‘মাম্মা’, জার্মানে ‘মাটার’, ইতালীয় ভাষায় ‘মাদ্রে’, চীনা ভাষায় ‘মামা’—প্রায় সব ভাষাতেই শব্দগুলো ‘ম’ ধ্বনি দিয়ে শুরু। ভাষাবিদ রোমান জ্যাকবসন (Roman Jakobson)-এর মতে, শিশুরা মায়ের দুধ পান করার সময় যে ধ্বনি উচ্চারণ করে, সেখান থেকেই ‘মা’ শব্দের উৎপত্তি।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উঁচু। ইসলামে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও সেবার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “জান্নাত মায়ের পায়ের নিচে।” পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতেও মায়ের সম্মান ও মর্যাদার কথা উল্লেখ রয়েছে। খ্রিস্টধর্মে কুমারী মেরির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্যেও মাতৃত্বের মহিমা ফুটে ওঠে। সনাতন ধর্মে মাতা ও ভূমিকে সমান পবিত্র মনে করা হয়, আর বৌদ্ধধর্মেও মাতৃত্ব বিশেষভাবে স্মরণীয়।

মা আমার গ্রামের সহজ-সরল মানুষ। নিজের কষ্ট, অভাব আর না-পাওয়ার গল্পগুলো আড়াল করে তিনি আমাদের মানুষ করেছেন। কতদিন নিজে না খেয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন—সেই হিসাব কখনো মেলানো যাবে না। বাবার মৃ’\ত্যুর পর মায়ের একাকীত্ব আজও আমাকে নাড়া দেয় গভীরভাবে।

শহরের ব্যস্ততা আর কোলাহলের সঙ্গে মা কখনো নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। তাই শহরে আমাদের কাছে এলেও দু-একদিনের মধ্যেই বাড়ি ফিরে যেতে চান। মা বলেন, “এই শহরে আমার মন টেকে না। বাড়িতেই তোমার বাবার স্মৃতি আছে, সামনেই তো তাঁর কবর।”

মায়ের এই কথাগুলো শুনলেই বুকের ভেতর জমে থাকা শূন্যতা যেন হঠাৎ জেগে ওঠে। বাবাকে হারানোর কষ্ট, গ্রামের সেই নিঃশব্দ উঠান আর মায়ের নিঃসঙ্গ মুখ—সব মিলিয়ে মনটা হুহু করে কেঁদে ওঠে। তখন মনে হয়, মা শুধু একজন মানুষ নন; তিনি পুরো জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়, সবচেয়ে গভীর ভালোবাসার নাম।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মা দিবসকে ঘিরে বাণিজ্যিকীকরণও বেড়েছে। ফুল, কার্ড, উপহার আর বিভিন্ন অফারের ভিড়ে দিবসটি অনেকাংশে ব্যবসায়িক রূপ পেয়েছে। এই প্রবণতার বিরোধিতা করেছিলেন মা দিবসের প্রবক্তা আনা জার্ভিস নিজেও। তাঁর মতে, মা দিবসের আসল উদ্দেশ্য ছিল মায়ের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করা—শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়।

প্রকৃত অর্থে মা দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—মায়ের প্রতি ভালোবাসা শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিদিন তাঁর পাশে থাকা, যত্ন নেওয়া এবং সম্মান করা। কারণ পৃথিবীর সব সম্পর্কের ঊর্ধ্বে একজন মায়ের ভালোবাসাই সবচেয়ে নিঃস্বার্থ, নির্মল ও চিরন্তন।