হা’\মে ৪০৯ শি’\শুর মৃ’\ত্যু: টিকা ক্যাম্পেইন স্থগিত, আন্দোলন আর অবহেলায় ভে’\ঙে পড়ল শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা

দেশে হা’\মে আ’\ক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৪০৯ জনের মৃ’\ত্যু হয়েছে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে ৫৬ জেলায়। হঠাৎ করে দেশজুড়ে হা’\মে আ’\ক্রান্ত ও মৃ’\ত্যুর এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে কারও অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইন না হওয়া, করোনা মহামারির সময় টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন, স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলন এবং ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচি বন্ধ থাকাই এই আউটব্রেকের প্রধান কারণ।

টিকা সংশ্লিষ্ট একাধিক ইপিআই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, হা’\মের এমআর টিকার কোনো ঘাটতি কখনও ছিল না। গত বছরের সেপ্টেম্বরেই ক্যাম্পেইনের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা দেশে এসে পৌঁছায়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ক্যাম্পেইন শুরু করা যায়নি। কখনও টাইফয়েড টিকা কার্যক্রম, কখনও জাতীয় নির্বাচন, আবার কখনও স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতির কারণে বারবার পিছিয়ে যায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি।

ইউনিসেফ (UNICEF)-এর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশু টিকার আওতায় না আসায় দেশে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে টিকা নিয়ে ভুল তথ্য ও গুজবও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে শিশুদের মধ্যে হা’\ম দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইপিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর, এরপর ডিসেম্বর—একাধিকবার তারিখ বদলানো হলেও শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের অস্থিরতায় কর্মসূচি কার্যকর করা যায়নি। চলতি বছরের ২০ এপ্রিল ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় হা’\ম ছড়িয়ে পড়ে।

নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের পরিসংখ্যানও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০১৯ সালে এমআর১ টিকার কভারেজ ছিল ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে নেমে আসে ৮৬ শতাংশে। একই সময়ে এমআর২ টিকার কভারেজ ৮৯ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়ায় ৮০ দশমিক ৭ শতাংশে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।

অন্যদিকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (Expanded Program on Immunization)-এর অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাস পর্যন্ত এমআর১ ও এমআর২ টিকার কভারেজ স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ডিসেম্বর মাসে স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের সময় টিকাদান কার্যক্রম কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে। ওই মাসে এমআর১ কভারেজ নেমে আসে ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশে এবং এমআর২ হয় মাত্র ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান সমন্বয়কারী মো. ওয়াসি উদ্দিন রানা বলেন, পদোন্নতি ও নিয়োগবিধি সংশোধনসহ ছয় দফা দাবিতে তারা আন্দোলন করেছিলেন। নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরজুড়ে দেশব্যাপী অস্থায়ী টিকাকেন্দ্রগুলোতে টিকা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। যদিও কিছু স্থায়ী কেন্দ্রে সীমিত কার্যক্রম চলেছে।

সাবেক ইপিআই উপ-পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের সময় অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রগুলো পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ফলে বড় ধরনের টিকা গ্যাপ তৈরি হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইপিআই থেকে কখনও টিকা সরবরাহ বন্ধ হয়নি।

পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচি বন্ধ থাকা। সাধারণত বছরে দুবার এই ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও সর্বশেষ তা অনুষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। এরপর আর কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি। রোগতত্ত্ববিদদের মতে, ভিটামিন ‘এ’ শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং নিউমোনিয়া ও অপুষ্টিজনিত জটিলতা কমায়। এই ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় হা’\মে আ’\ক্রান্ত শিশুদের জটিলতা মারাত্মক আকার নিয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. তাজুল ইসলাম বারী (Dr. Tajul Islam Bari) বলেন, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির পর আর জাতীয় হা’\ম ক্যাম্পেইন হয়নি। ফলে কয়েক বছরে বড় রোগপ্রতিরোধ ঘাটতি তৈরি হয়। গত সেপ্টেম্বরে দেশে আসা টিকা দিয়ে যদি দ্রুত ক্যাম্পেইন করা যেত, তাহলে হয়তো এই আউটব্রেক এড়ানো সম্ভব হতো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস (Prof. Dr. Prabhat Chandra Biswas) বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে বিপুলসংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকার বাইরে থেকে গেছে। জাতীয় ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ইতোমধ্যে আইইডিসিআর (IEDCR)-কে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে গবেষণার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হা’\মে এতো শি’\শুর মৃ’\ত্যুর পেছনে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অবহেলা বা সমন্বয়হীনতা ছিল কি না—তা তদন্ত করে দেখা হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য জাতীয় টিকাদান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।