বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যে বাড়তে থাকা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনার আবহে ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) বুধবার (১৩ মে) সন্ধ্যায় চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন। এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে নামার পর তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা জানান হান ঝেং (Han Zheng), যিনি চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
দুই দিনের এই সফরে শি জিনপিং (Xi Jinping)-এর সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মুখোমুখি বৈঠকে বসবেন ট্রাম্প। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে বাণিজ্য ঘাটতি, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, ইরান যু’\দ্ধ এবং তাইওয়ান প্রশ্ন। বিশ্লেষকদের মতে, এবার ট্রাম্প এমন এক চীনের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা ২০১৭ সালের তুলনায় অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম চীন সফরে তাকে স্বাগত জানাতে তুলনামূলক নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এবার উচ্চপদস্থ নেতাকে দিয়ে অভ্যর্থনা জানানোর ঘটনাকে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব ও কূটনৈতিক সম্মান প্রদর্শনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিমানবন্দরে ব্রাস ব্যান্ড বাজানো হয় এবং চীনা ও মার্কিন পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা স্বাগতকারীরা ‘স্বাগতম, উষ্ণ স্বাগতম’ বলে স্লোগান দেন। জবাবে ট্রাম্প তার পরিচিত ভঙ্গিতে মুষ্টি উঁচিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান।
এই সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে রয়েছেন তার ছেলে এরিক ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও করপোরেট খাতের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের মধ্যে আছেন ইলন মাস্ক (Elon Musk), এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, অ্যাপলের টিম কুক, ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্ক এবং বোয়িংয়ের কেলি অর্টবার্গ।
বেইজিংয়ে পৌঁছানোর আগে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট শি-কে চীনকে আরও ‘উন্মুক্ত’ করার আহ্বান জানাবেন। ট্রাম্পের ভাষায়, “আমি প্রেসিডেন্ট শি-কে, যিনি অসাধারণ মেধার একজন নেতা, চীনকে উন্মুক্ত করার অনুরোধ করব, যাতে এই মেধাবী মানুষেরা তাদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে আরও এগিয়ে নিতে পারেন।” তিনি আরও জানান, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে এটিই হবে তার “প্রথম অনুরোধ”।
মূলত মার্চ মাসে এই সফর হওয়ার কথা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যু’\দ্ধ ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণে তা পিছিয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনাও বাড়ছে, যার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাণিজ্য ইস্যুতেও দুই দেশের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। শুল্কযু’\দ্ধ, রপ্তানি বিধিনিষেধ এবং পারস্পরিক চাপের কারণে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ কমে এসেছে। ২০২২ সালে যেখানে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৬৯০ কোটি ৪০ লাখ ডলার, সেখানে গত বছর তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৪১৪ কোটি ৭০ লাখ ডলারে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টিও ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম উদ্বেগ হিসেবে সামনে রয়েছে। গত বছর চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করেছে, তার তুলনায় রপ্তানি ছিল ২ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি কম।
আসন্ন আলোচনায় ট্রাম্প চাইবেন চীন যেন আরও বেশি পরিমাণে মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি করে। বিপরীতে বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য থাকবে চীনা পণ্যের ওপর আরোপিত মার্কিন শুল্ক হ্রাসে চাপ সৃষ্টি করা।
প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও উত্তেজনা কম নয়। চীন (China) বর্তমানে বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রতিযোগিতায় নিজেদের শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে কাজ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি উন্নত কম্পিউটিং চিপের চাহিদাও বাড়াচ্ছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে যে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি চু’\রি করতে পারে। সে কারণেই ওয়াশিংটন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করেছে।
এই বাস্তবতায় বিরল খনিজ ধাতুর রপ্তানি ইস্যুকেও বেইজিং একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খনিজ সম্পদ অতীতেও ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যবহার করেছিল চীন।


