দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ক্ষমতার পালাবদলের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা বিএনপি (BNP) এখন দল ও সরকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা দলের অনেক শীর্ষ নেতা একই সঙ্গে জেলা, মহানগর ও থানা পর্যায়ের প্রভাবশালী সাংগঠনিক পদেও দায়িত্ব পালন করছেন। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও দলীয় রাজনীতির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছে দলটির নীতিনির্ধারণী মহল।
এই বাস্তবতায় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে বিএনপি। দলীয় সূত্র বলছে, কেন্দ্রীয় পদ ছাড়া জেলা, মহানগর ও থানা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদগুলোতে নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও গতিশীল করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে সরকারের দায়িত্বে থাকা বহু মন্ত্রী ও এমপিকে দলীয় পদ ছাড়তে হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি এবার আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ইঙ্গিত মিলছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman) দেশের রাজনীতিকে তৃণমূলমুখী করতে যে সাংগঠনিক মডেল চালু করেছিলেন, তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল— যারা মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য থাকবেন, তারা মাঠপর্যায়ের শীর্ষ দলীয় পদে থাকবেন না। সেই নীতির ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি গঠনতন্ত্রে যুক্ত করা হয়।
বিষয়টি নিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু (Shamsuzzaman Dudu) বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় দল ও সরকারের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন বজায় রাখা হতো। সে সময় কোনো নেতা মন্ত্রী বা এমপি হলে অন্যদের নেতৃত্বের সুযোগ করে দিতে জেলা বা মহানগরের পদ থেকে সরে দাঁড়াতেন। তার ভাষ্য, বর্তমান সরকার ও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমও সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় সমন্বিতভাবে এগোবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর বিএনপি (Dhaka Metropolitan BNP), যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের অন্তত ছয়জন প্রভাবশালী নেতা ইতোমধ্যে মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য হয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান, ঢাকা-১৮ আসনের এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন, ফেনী-১ আসনের রফিকুল আলম মজনু, ভোলা-৪ আসনের নূরুল ইসলাম নয়ন এবং গোপালগঞ্জ-৩ আসনের এসএম জিলানী।
সূত্রগুলো বলছে, এসব নেতাকে সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে জেলা ও মহানগর পর্যায়ের আরও বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা এই সিদ্ধান্তের আওতায় আসতে পারেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, লালমনিরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু, পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, কক্সবাজার-৪ আসনের শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৮ আসনের এরশাদ উল্যাহ এবং নরসিংদী-১ আসনের খায়রুল কবির খোকন।
এছাড়া বান্দরবানের সাচিং প্রু, সিলেটের এমরান আহমদ চৌধুরী, নরসিংদীর মনজুর এলাহী, জামালপুরের ফরিদুল কবীর তালুকদার শামীম ও শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন, চাঁদপুরের শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামলসহ আরও কয়েকজন সংসদ সদস্যকে জেলা বা মহানগরের সাংগঠনিক পদ ছাড়তে হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর দলীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং প্রশাসনে গতি আনতেই বিএনপি এই কৌশলী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তাদের মতে, একই ব্যক্তির হাতে দল ও সরকারের দ্বৈত দায়িত্ব থাকলে মাঠপর্যায়ে স্থবিরতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, তারেক রহমান (Tarique Rahman) যদি সত্যিই জিয়াউর রহমানের পুরোনো সাংগঠনিক মডেল পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন, তাহলে বিএনপিতে নতুন ও তরুণ নেতৃত্ব তৈরির পথ আরও উন্মুক্ত হবে। একইসঙ্গে সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও মন্ত্রী ও এমপিদের পূর্ণ মনোযোগ নিশ্চিত করা সহজ হবে।
