ট্রাম্প সফরের পরই পুতিনকে বেইজিংয়ে রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা, নতুন বার্তা দিল চীন

চীন (China) আবারও স্পষ্ট করে দিল, বৈশ্বিক কূটনীতিতে তারা নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে সাজাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফর শেষ হওয়ার মাত্র চার দিনের মাথায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিংয়ে স্বাগত জানিয়েছে দেশটি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দুই দিনের সফরে চীনে পৌঁছান পুতিন। বেইজিং বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।

এটি পুতিনের ২৫তম চীন সফর। বিশ্লেষকদের মতে, এত ঘন ঘন উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনীতি নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা ও কৌশলগত অবস্থানের প্রতিফলন। একইসঙ্গে এটি শি জিনপিং (Xi Jinping) ও ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin)-এর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বোঝাপড়ার গভীরতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্রেইন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগে বেইজিংকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া (Russia) ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি, বাণিজ্য এবং আর্থিক লেনদেনে দুই দেশের সহযোগিতা এখন আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় গভীর।

এই সফরের সময়টিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে ইরানকে ঘিরে বৈশ্বিক অস্থিরতা বাড়ছে, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠক থেকেও উল্লেখযোগ্য কোনও অগ্রগতি আসেনি। ঠিক সেই মুহূর্তে পুতিনের বেইজিং সফরকে অনেকেই ওয়াশিংটনের প্রতি একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন।

সফরের অংশ হিসেবে রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই উন্নয়ন এবং এর পরিচালনা কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি, ২০০১ সালে স্বাক্ষরিত ‘সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’র ২৫ বছর পূর্তিকেও এই সফরের অন্যতম প্রতীকী দিক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

দুই নেতা এখন পর্যন্ত ৪০ বারের বেশি বৈঠক করেছেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কোনও পশ্চিমা নেতার বৈঠকের সংখ্যাও এত বেশি নয়। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন কেবল কূটনৈতিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলছে।

‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেছেন, অল্প সময়ের ব্যবধানে বিশ্বের দুই প্রভাবশালী নেতাকে আতিথেয়তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে চীন তাদের কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছে। তার মতে, শি জিনপিং এভাবেই ওয়াশিংটনকে বোঝাতে চাইছেন যে, চীনের পাশে এখনও শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার রয়েছে।

অন্যদিকে ইউক্রেইন যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় রাশিয়ার ভেতরেও চাপ বাড়ছে। অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হওয়ায় বেইজিংয়ের ওপর মস্কোর নির্ভরশীলতা ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। অনেকের মতে, এতে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে আরও একপেশে হয়ে উঠছে, যেখানে চীনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান।

সফরের আগে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় পুতিন বলেন, চীন-রাশিয়া সম্পর্ক বর্তমানে “এক নজিরবিহীন উচ্চতায়” পৌঁছেছে। তিনি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, ডলারের পরিবর্তে রুবল ও ইউয়ানে লেনদেন এবং দুই দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত ভ্রমণ ব্যবস্থার বিষয়ও তুলে ধরেন।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন জানিয়েছেন, শি জিনপিং ও পুতিনের কৌশলগত নেতৃত্বে দুই দেশের বন্ধুত্ব আরও গভীর হবে এবং তা জনগণের মধ্যেও আরও শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে।