পল্লবীর শিশু হ’\ত্যা: আদালতে দায় স্বীকার, শোক আর ক্ষোভে ভারী পুরো এলাকা

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সাত বছরের এক শিশুর নৃশংস হ’\ত্যাকাণ্ড পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে। যে বয়সে একটি শিশুর সকাল শুরু হওয়ার কথা বই-খাতা আর স্কুলের ব্যস্ততায়, সেই বয়সেই তার জীবন থেমে গেল এক ভয়াবহ ঘটনায়। রাজধানীর মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি আবাসিক ভবনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে নি’\হত দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তার (Ramisa Akter)-এর ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা (Sohel Rana) আদালতে নিজের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও, শিশুটির পরিবারের শোক ও ক্ষোভ এখনো প্রশমিত হয়নি।

দরজার ওপাশে লুকিয়ে ছিল বিভীষিকা

পল্লবীর একটি আবাসিক ভবনে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন রামিসার পরিবার। অন্যদিকে, অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (Swapna Akter) মাত্র দুই মাস আগে একই ভবনের বিপরীত পাশের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া আসেন।

পরিচয়ের সূত্রেই দুই পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে শিশুটিকে কৌশলে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজতে শুরু করেন।

খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে শিশুটির জুতা দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। এরপর দরজায় সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় ভেতরে প্রবেশ করা হলে নি’\হত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়।

‘আমি বিচার চাই না’—একজন বাবার অসহায় আর্তনাদ

শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা (Abdul Hannan Molla) গণমাধ্যমের সামনে গভীর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, বিচারব্যবস্থার প্রতি তার আস্থা দুর্বল হয়ে গেছে।

তার বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বেদনা। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সময়ের সঙ্গে অনেক আলোচিত ঘটনা যেমন চাপা পড়ে যায়, এই ঘটনাও হয়তো তেমন পরিণতির দিকে যেতে পারে।

পালানোর চেষ্টা, পরে গ্রেপ্তার

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর সোহেল রানা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে নারায়ণগঞ্জ (Narayanganj)-এর ফতুল্লা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অন্যদিকে, তদন্তকারীরা অভিযোগ করেছেন যে অভিযুক্তের স্ত্রী ঘটনাপরবর্তী পরিস্থিতিতে তাকে পালাতে সহায়তা করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্টের চেষ্টাও করা হয়েছে বলে সন্দেহ রয়েছে।

আদালতে স্বীকারোক্তি, চলছে তদন্ত

গ্রেপ্তারের পর আদালতে হাজির করা হলে সোহেল রানা স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

অন্যদিকে স্বপ্না আক্তারকে আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শেষে তাকেও কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং ফরেনসিক ও কেমিক্যাল রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর তদন্তের আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত হওয়া যাবে।

দ্রুত বিচারের দাবিতে সরব বিভিন্ন মহল

এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন, শিশু অধিকারকর্মী এবং অভিভাবকরা দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

একইসঙ্গে আবাসিক এলাকায় ভাড়াটিয়া যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার দাবিও উঠেছে।

পল্লবী এলাকায় এখনো শোকের ছায়া বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, প্রতিদিন চোখের সামনে দেখা কোনো মানুষ যে এমন ভয়াবহ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, তা তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল।

আইনি প্রক্রিয়া তার নিজস্ব গতিতে এগোলেও, শিশুটির বাবার কণ্ঠে উচ্চারিত সেই প্রশ্ন— “বিচার হবে তো?”— এখন বহু মানুষের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে।