আট বছরের শিশু রামিসার ধ’\র্ষণ ও হ’\ত্যার ঘটনার পর দেশজুড়ে যে শোক, ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল, মামলার চার্জশিটে উঠে আসা তথ্য সেই আলোচনাকে আরও গভীর করেছে। অপরাধবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেও এই ঘটনার নৃশংসতা বহু প্রশ্নের উত্তরকেই যেন স্তব্ধ করে দিয়েছে। ঘটনার পর দেশব্যাপী প্রতিরোধ ও বিচারের দাবির মুখে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এক সপ্তাহেরও কম সময়ে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।
৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে যে বিবরণ উঠে এসেছে, তা রামিসার শেষ সময়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার একটি চিত্র তুলে ধরে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাথা বিচ্ছিন্ন করার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শকের কারণে তার মৃত্যু হয়। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শরীরে পাওয়া সব আঘাত মৃত্যু-পূর্ববর্তী অবস্থায় বা জীবিত থাকা অবস্থায় সংঘটিত হয়েছিল।
ধ’\র্ষণ ও নৃশংস হ’\ত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মাত্র পাঁচ দিনের তদন্ত শেষে ২৫ মে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। আজ অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। অভিযোগপত্রে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা (৩০)-এর বিরুদ্ধে ধ’\র্ষণ, হ’\ত্যা এবং আলামত নষ্টের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন (২৬)-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং আলামত নষ্টে সহযোগিতার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, প্রায় আড়াই মাস আগে পল্লবী (Pallabi) এলাকার ১১ নম্বর সেকশনের ‘বি’ ব্লকের ২ নম্বর লেনের একটি বাসা ভাড়া নেন সোহেল। অটোরিকশা মেকানিক হিসেবে কাজ করা সোহেলের ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটটিতে ছিল তিনটি কক্ষ। একটি কক্ষে তিনি ও তার স্ত্রী স্বপ্না থাকতেন, যার সঙ্গে একটি বাথরুম সংযুক্ত ছিল। অপর দুটি কক্ষে বসবাস করতেন মাসুদ পারভেজ ও জেসমিন আক্তার দম্পতি। আলাদা কক্ষ হলেও রান্নাঘর ছিল সবার জন্য যৌথ।
তদন্তে উঠে এসেছে ঘটনার দিনের একটি বিস্তারিত চিত্র। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, রামিসার বাবা-মা মাসুদ পারভেজ ও জেসমিন আক্তার প্রতিদিনের মতো ১৯ মে সকালেও কাজের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। সকাল প্রায় সাড়ে ৯টার দিকে সোহেল শিশুটিকে নিজের কক্ষে ডেকে নেয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কথাও অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০ মে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (Dhaka Metropolitan Magistrate Court)-এ দেওয়া জবানবন্দিতে সোহেল মাদক সেবনের কথা স্বীকার করে। সেখানে বলা হয়, শিশুটিকে ঘরে ডাকার পর বাথরুমে নিয়ে গিয়ে ধ’\র্ষণ করা হয়। সে সময় রামিসা চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয়। পরে শিশুটি অচেতন হয়ে পড়লে অভিযুক্ত মনে করে সে মারা গেছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে একটি ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে মরদেহ বিকৃত করার চেষ্টা করা হয়। তদন্তকারীরা এটিকে অপরাধের আলামত গোপনের উদ্দেশ্যে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হ’\ত্যার পর কী ঘটেছিল এবং কারা অভিযুক্তকে সহায়তা করেছে, সেই বিষয়েও অভিযোগপত্রে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। সোহেলের দাবি অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আশপাশের লোকজন রামিসাকে খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তার মা সোহেলের কক্ষের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পেয়ে ডাকাডাকি শুরু করেন। কোনো সাড়া না পেয়ে স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে দরজায় ধাক্কা দেওয়া হয়।
জবানবন্দিতে আরও বলা হয়েছে, ওই সময় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না তাকে পালিয়ে যেতে পরামর্শ দেন। এরপর কক্ষে থাকা একটি রেঞ্জ ব্যবহার করে জানালার গ্রিল ভেঙে সোহেল পালিয়ে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, অধিকাংশ মানুষ তখন কক্ষের মূল দরজার সামনে অবস্থান করছিলেন এবং স্বপ্না ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন।
