স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীদের পথ রুদ্ধের উদ্যোগ, আচরণ বিধিমালায় নতুন শর্ত আনছে ইসি

জাতীয় সংসদের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ হওয়ার পথে। কারণ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য নিষিদ্ধ দলগুলোর নেতাকর্মীরা যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে লক্ষ্যে নির্বাচন আচরণ বিধিমালাগুলোতে নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক সম্ভাব্য প্রার্থীদের ইসির নির্ধারিত একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করে জানাতে হবে যে, নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অঙ্গীকারনামায় ভুল বা গোপন তথ্য দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে ইসির। এর ফলে পদধারী আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটির কার্যক্রম ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ রয়েছে।

ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়রদের প্রচারে অংশগ্রহণের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র সংজ্ঞায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ফলে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সিটি করপোরেশনের মেয়রদের মতো তারাও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না।

সম্প্রতি এসব বিধিমালার খসড়া প্রস্তুত করেছেন ইসির কর্মকর্তারা। ঈদের ছুটির আগে শেষ কর্মদিবসে খসড়াগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল (Kazi Habibul Awal) ও অন্য কমিশনারদের কাছে পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই এগুলো নিয়ে কমিশনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, ইউনিয়ন পরিষদ আচরণ বিধিমালার খসড়াকে অনেকটা মডেল হিসেবে কমিশনের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেসব সংশোধনীতে কমিশন একমত হবে, সেগুলো পরবর্তীতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদ নির্বাচনের আচরণ বিধিমালায় প্রয়োজন অনুযায়ী যুক্ত বা বিয়োজন করা হবে। তারা আরও জানান, নির্বাচন কমিশনের আইন সংস্কার কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরিচালনা ও আচরণ বিধিমালার সংশোধনী নিয়ে আলোচনা শেষে এসব খসড়া তৈরি করা হয়েছে। কমিশনারদের মতামতের ভিত্তিতে খসড়াগুলোতে আরও পরিবর্তন আসতে পারে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (Election Commission) কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারনামা জমা দেওয়ার বিধান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। আওয়ামী লীগকে লক্ষ্য করে এই বিধান আনা হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট দলকে সামনে রেখে এটি করা হচ্ছে না। দেশে কয়েকটি নিষিদ্ধ সংগঠন রয়েছে এবং বিদ্যমান আইন বিবেচনায় নিয়েই এই প্রস্তাব আনা হচ্ছে।

আরও জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে আয়োজনের জন্য জাতীয় সংসদে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করা হয়েছে। সেই আইন অনুসারে আচরণ বিধিমালা ও পরিচালনা বিধিমালা থেকে রাজনৈতিক দলসংক্রান্ত বিভিন্ন অংশ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন ইসির কর্মকর্তারা। এ লক্ষ্যে কয়েকটি বিধি ও উপবিধি থেকে ‘রাজনৈতিক দল’ শব্দটি অপসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

এই পরিবর্তন কার্যকর হলে নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের অনুদান দিলে বা রাজনৈতিক ইস্যুতে সভা-সমাবেশ করলে তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ইসির হাতে থাকবে না। এমনকি আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে যে শাস্তির বিধান রয়েছে, সেটিও বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনে কাগজের পোস্টার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, ব্যানার-ফেস্টুনে রাজনৈতিক নেতাদের ছবি ব্যবহার বন্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে প্রচারের সুযোগ দেওয়ার মতো সংশোধনীও যুক্ত করা হয়েছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি দূর হবে না। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami), জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizen Party) এবং আরও কয়েকটি দল বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীদের নিয়ে তৎপরতা শুরু করেছে।

ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী (Jesmin Tuli) বলেন, অতীতের বহু নির্দলীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন না দিলেও প্রার্থীদের সমর্থন করেছে এবং তাদের পক্ষে মাঠে কাজ করেছে। ভবিষ্যতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ তুলে দিলে নির্বাচনকালে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় গণহারে মানুষ হ’\ত্যার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও আচরণ বিধিমালায় সংশোধনী আনা হয়েছিল। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিধান বাতিল এবং নতুন ‘অঙ্গীকার’ বিধি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগসহ নিষিদ্ধ দলগুলোর পদধারী নেতা-কর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে যাবে।

এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণ বিধিমালায় ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র সংজ্ঞায় উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়রদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অতীতে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে বিভিন্ন নির্বাচনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠায় এবার বিষয়টি আবার সামনে এসেছে।

বর্তমানে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান বা মেয়রদের জায়গায় প্রশাসকেরা দায়িত্ব পালন করছেন। চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে, যদিও কোন স্তরের নির্বাচন আগে হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

খসড়া আচরণ বিধিমালা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১০টির বেশি বিধি ও উপবিধি থেকে ‘রাজনৈতিক দল’ শব্দটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনি অনুদান, প্রচার, সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং ভোটকেন্দ্র এলাকায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপস্থিতি সংক্রান্ত বিধান।

বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, দলীয় বা সাংগঠনিকভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে জরিমানা করা যায়। কিন্তু নতুন খসড়ায় সেই উপবিধি বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো দল আচরণবিধি ভঙ্গ করলেও তাদের বিরুদ্ধে ইসির শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।

অন্যান্য সংশোধনীর মধ্যে কাগজের পোস্টার ও রেক্সিনের তৈরি প্রচারসামগ্রী নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে কাপড় ও চটের তৈরি ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহার করা যাবে। প্রচারসামগ্রীতে রাজনৈতিক নেতাদের ছবি ব্যবহার করা যাবে না; শুধু প্রার্থী ও নির্বাচনি প্রতীকের ছবি থাকবে। এমনকি দলীয় প্রধানের ছবিও ব্যবহার করা যাবে না। একটি ওয়ার্ডে একটি বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।

এছাড়া ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নির্বাচনি প্রচারণার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে কারও বিরুদ্ধে অপপ্রচার বা বিষোদগার করা যাবে না বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।