আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ায় সরকারকে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (Anindya Islam Amit)। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এলে সরকারও দ্রুত মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে সেই সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেবে।
সোমবার (১ জুন) দুপুরে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্প্রতি টানা দুই দফা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতি মাসেই মূল্য সমন্বয়ের একটি নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে। তবে মে মাসে কোনো ধরনের সমন্বয় করা হয়নি। সরকারের অবস্থান সবসময়ই এমন যে, একান্ত প্রয়োজন না হলে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হবে না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু ক্ষেত্রে মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৬ শতাংশই ডিজেল। এই খাতেই সরকারকে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দিতে হয়। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যাতে আরও না বাড়ে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত নিরসন হবে বলে সরকার প্রত্যাশা করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে এলে সরকারও দ্রুত সেই সুবিধা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
তিনি বলেন, এটি একটি নির্বাচিত সরকার এবং জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাই মানুষের কষ্ট কমাতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়ার বিষয়ে সরকার আন্তরিক।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে কাজ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC)। কোনো প্রস্তাব এলে তা গণশুনানির মাধ্যমে পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত করা হয়। কমিশনের স্বাধীন ক্ষমতা পুনর্বহাল করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সময় দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানোর সমালোচনার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাজারে দাম বৃদ্ধি পেলেও সরকার অনেক সময় সেই পুরো চাপ তাৎক্ষণিকভাবে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়নি। ফলে ভর্তুকির কারণে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতে ব্যয় অব্যাহত রাখতে হলে ভর্তুকি ব্যবস্থাকেও বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করতে হয়। তাই অনেক সময় কঠিন হলেও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমাতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের পরিবর্তে ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে, ভর্তুকির চাপ হ্রাস পাবে এবং গ্রাহকরাও তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন।
এ ছাড়া অফশোর জ্বালানি অনুসন্ধান, ইস্টার্ন রিফাইনারি (Eastern Refinery)-এর দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে এলএনজি আমদানি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকিনির্ভরতা কমিয়ে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
