ভারতের মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’সহ একাধিক জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ক্ষোভ আরও তীব্র হচ্ছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান (Dharmendra Pradhan)-এর পদত্যাগের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janata Party-CJP)-এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে (Abhijeet Dipke)। এ তথ্য জানিয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (The Indian Express)।
সোমবার (১ জুন) সিজেপির ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় অভিজিৎ বলেন, ভারতের সংবিধানের পথ অনুসরণ করে সবাইকে একত্রিত হওয়ার সময় এসেছে। তার ভাষায়, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে যদি দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে শান্তিপূর্ণ কণ্ঠ তোলে, তাহলে সরকারকে সেই বার্তা শুনতেই হবে।
তিনি জানান, আগামী ৬ জুন শনিবার সকালে তিনি দিল্লিতে পৌঁছাবেন। সমর্থকদের বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে তার সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সেখান থেকে তারা একসঙ্গে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় গিয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অনুমতি চাইবেন।
ঘোষণাটি আসে দিল্লি হাইকোর্ট ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে সিজেপির অ্যাকাউন্ট পুনরায় চালুর আবেদন খারিজ করে দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই।
ভিডিওতে অভিজিৎ আরও বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিক মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ব্যাপক প্রচারণা চলছে। প্রশ্নফাঁসের ঘটনার কারণে যে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করেছে এবং লাখো শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম মূল্যহীন হয়ে গেছে, তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার দাবি, এ দাবির সমর্থনে চালু করা অনলাইন পিটিশনে ইতোমধ্যে আট লাখের বেশি শিক্ষার্থী স্বাক্ষর করেছেন। পাশাপাশি কোটি কোটি মানুষ সামাজিক মাধ্যমে এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। লক্ষ্ণৌ, জয়পুর ও মহারাষ্ট্রসহ বিভিন্ন স্থানে এ ইস্যুতে বিক্ষোভও চলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অভিজিৎ বলেন, নিট পরীক্ষার ২২ লাখ, সিবিএসইর ১৭ লাখ, সিইউইটির ১৬ লাখ এবং এসএসসি জিডির ৪০ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীসহ প্রায় এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ ও হতাশার জন্য কাউকে না কাউকে দায় নিতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কী এই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’?
গত মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করে সামাজিক মাধ্যমে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি অ্যাকাউন্ট চালু করেন অভিজিৎ দীপকে। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি তরুণদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশের একটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। মিম, ব্যঙ্গ এবং রাজনৈতিক উপহাসের মাধ্যমে বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু সেখানে তুলে ধরা হতো।
তবে মে মাসের শেষ দিকে ভারতের গোয়েন্দা ব্যুরোর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দেশটির ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯(এ) ধারার আওতায় ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র কারণ দেখিয়ে ভারতে সিজেপির ‘এক্স’ অ্যাকাউন্ট ব্লক করার নির্দেশ দেয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন অভিজিৎ।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিজেপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা অভিযোগ করেছেন, সিজেপির পেছনে বিদেশি শক্তির সমর্থন রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। অভিজিৎ বলেন, তার পরিবার ও বন্ধুরা আশঙ্কা করছেন যে ভারতে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকেই তাকে গ্রেফতার করা হতে পারে। তবুও দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর তার আস্থা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা নিট প্রশ্নফাঁস
চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে ভারতের অন্যতম বৃহৎ মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি’-র প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ২২ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষাটি শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
পরীক্ষা বাতিলের মানসিক ধাক্কা সামলাতে না পেরে অন্তত দুজন শিক্ষার্থী আ’\ত্মহ’\ত্যা করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পরীক্ষাটি পুনরায় আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং আগামী ২১ জুন নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রশ্নফাঁসের ঘটনার তদন্তভার পেয়েছে সিবিআই (Central Bureau of Investigation-CBI)। তদন্তে এখন পর্যন্ত প্রশ্নপত্র অনুবাদক, বিষয়বিশেষজ্ঞ এবং মধ্যস্থতাকারীসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও ব্যর্থতার কারণেই এই নজিরবিহীন প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।


