যুদ্ধ ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহী মানুষের কাছে বায়রাক্টার টিবি-টু নামটি বেশ পরিচিত। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে এই ড্রোনের কার্যকর ব্যবহার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে তুলনামূলক কম খরচে উচ্চ কার্যকারিতার কারণে ড্রোনটি আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রব্যবস্থা হিসেবে পরিচিতি পায়। এবার সেই বায়রাক্টার টিবি-টু ড্রোন বাংলাদেশে উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তুরস্ক (Turkey)।
জানা গেছে, তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসা হাকান ফিদান (Hakan Fidan) এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক এবং পরবর্তীতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ ও ড্রোন উৎপাদন সহযোগিতার বিষয়ে আগ্রহের কথা তুলে ধরেন।
পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালেও দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন হাকান ফিদান। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে সমন্বয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি যৌথ কমিটি গঠনের বিষয়েও আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ ও তুরস্ক কেন ক্রমেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে, সে বিষয়ে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (Jahangirnagar University)-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী আকবর (Dr. Ali Akbar)। তার মতে, মুসলিম বিশ্বে নিজেদের প্রভাব আরও বিস্তৃত করার কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে তুরস্কের। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও এখন বাংলাদেশের সঙ্গেও সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগ্রহী আঙ্কারা।
ড. আলী আকবর বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে তুরস্কের প্রতি একটি ইতিবাচক সাংস্কৃতিক ও আবেগগত সংযোগ রয়েছে। ফলে তুরস্ক যদি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ করে বা যৌথ উদ্যোগে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে এগিয়ে আসে, তাহলে তা দেশের অভ্যন্তরে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে না।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, বাংলাদেশ এখন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বহুমুখী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার কৌশলের অংশ হিসেবে নতুন সহযোগিতার সুযোগ খুঁজছে ঢাকা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জামের গ্রহণযোগ্যতাও ক্রমশ বাড়ছে। এই বাস্তবতাগুলো বিবেচনায় নিয়েই দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার আলোচনা এগোচ্ছে।
বাংলাদেশে ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ড. আলী আকবর বলেন, বিষয়টি এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে বাংলাদেশ যেহেতু তার সামরিক খাতকে আধুনিকায়নের দিকে নিয়ে যেতে চায় এবং তুরস্কও এ খাতে আগ্রহ দেখাচ্ছে, তাই ভবিষ্যতে এমন কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী (Bangladesh Armed Forces) তুরস্ক থেকে বায়রাক্টার টিবি-টু ড্রোন ক্রয়ের জন্য চুক্তি করে। ড্রোনটি নির্মাণ করে তুরস্কের বাইকার টেকনোলজি (Baykar Technology) কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে বায়রাক্টার টিবি-টু উৎপাদন ও রপ্তানি করছে।
তবে ড্রোনটির আন্তর্জাতিক খ্যাতি মূলত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এর আগে সিরিয়া ও লিবিয়ার সংঘাতেও এর কার্যকর ব্যবহার দেখা যায়। এছাড়া নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধেও বায়রাক্টার টিবি-টু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বলে সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।
এসব সংঘাতে সফল ব্যবহারের পর বিশ্ববাজারে ড্রোনটির চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। জানা গেছে, ইতোমধ্যে বিশ্বের ১৪টি দেশ তুরস্ক থেকে এই ড্রোন সংগ্রহ করেছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ইউক্রেন, আজারবাইজান, ইথিওপিয়া, লিবিয়া, মরক্কো, পোল্যান্ড, কাতার এবং তুর্কমেনিস্তান। এছাড়া আরও ১৬টি দেশ বায়রাক্টার টিবি-টু ক্রয়ের জন্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের চলমান আলোচনার ফলে ভবিষ্যতে ড্রোন প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সামরিক সক্ষমতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন সহযোগিতার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
