দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কথিত পুশইন প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কঠোর অবস্থানের মুখে একের পর এক চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। শুধু বিজিবিই নয়, সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষও সক্রিয়ভাবে সীমান্ত সুরক্ষার কাজে অংশ নিচ্ছেন। কোথাও স্থানীয় বাসিন্দারা, কোথাও আবার গ্রাম পুলিশ সদস্যরা বিজিবির সঙ্গে মাঠে নেমে দায়িত্ব পালন করছেন।
সর্বশেষ বিভিন্ন সীমান্তে পুশইনের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বিএসএফ লালমনিরহাট সীমান্ত থেকে ৩২ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে ২৮ জন এবং পাটগ্রাম সীমান্ত থেকে ১০ জনকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে পঞ্চগড় সীমান্তে এখনো ভারতীয় অংশের শূন্যরেখায় ১০ জন ভারতীয় নাগরিক অবস্থান করছেন।
গাংনী সীমান্তে ভোরের উত্তেজনা
শনিবার ভোরে গাংনী (Gangni) উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্ত এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়ে যে ভারতীয় সীমান্তের দিক থেকে কয়েকজন নারী, পুরুষ ও একটি শিশুকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। খবর পেয়ে মুহূর্তেই সীমান্ত এলাকায় জড়ো হন স্থানীয় বাসিন্দারা। সতর্ক অবস্থান নেয় বিজিবিও।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ওই দলে তিনজন পুরুষ, তিনজন নারী এবং একটি শিশু ছিল। বিএসএফ কাঁটাতারের গেট খুলে তাদের বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধের মুখে তারা সীমান্ত অতিক্রম করতে পারেননি। বর্তমানে তারা ভারতীয় সীমান্তের ভেতরে কাঁটাতারের কাছাকাছি অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিজিবি সদস্যদের পাশাপাশি হ্যান্ডমাইকে প্রচার চালিয়ে স্থানীয়দের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (Border Guard Bangladesh – BGB)-এর তেঁতুলবাড়িয়া ক্যাম্পের কমান্ডার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইনের চেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না এবং পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে।
কুষ্টিয়ায় বিজিবির পাশে সীমান্তবাসী
কুষ্টিয়া (Kushtia) সীমান্তে গত কয়েকদিন ধরে বিএসএফের একাধিক পুশইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি। তবে এবার সীমান্ত সুরক্ষায় নতুন এক চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও বিজিবির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারতীয় পুলিশ ও বিএসএফ সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ একাধিক দল জড়ো করছে এবং পরে সুযোগ বুঝে তাদের সীমান্তের কাছে এনে পুশইনের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় এই তৎপরতা বাড়ছে বলে দাবি তাদের।
দৌলতপুর সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা বুলবুল ইসলাম বলেন, অবৈধভাবে কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সীমান্তবাসী হিসেবে তারা বিজিবির পাশে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।
৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, সীমান্ত এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজিবির সঙ্গে টহল কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন, যা দেশপ্রেমের একটি অনন্য উদাহরণ।
হিলি সীমান্তে মাঠে নেমেছে গ্রাম পুলিশ
হিলি (Hili) সীমান্তে পুশইন প্রতিরোধে এবার বিজিবির সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন গ্রাম পুলিশ সদস্যরা। শনিবার সকাল থেকে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে তাদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
এদিকে ঘাসুড়িয়া সীমান্ত দিয়ে পাঁচ ভারতীয় নাগরিককে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বিজিবি। জয়পুরহাট-২০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল লতিফুল বারী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
লালমনিরহাট ও পাটগ্রামে ফিরিয়ে নেওয়া হলো মানুষজনকে
লালমনিরহাট (Lalmonirhat)-এর তিন উপজেলার চারটি সীমান্ত দিয়ে শুক্রবার পুশইনের চেষ্টা চালানো হয় বলে জানিয়েছে বিজিবি। তবে ব্যর্থ হয়ে বিএসএফ শিশু ও নারীসহ ৩২ জনকে পুনরায় নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেয়।
একইভাবে পাটগ্রাম সীমান্তে ১০ জন ভারতীয় নাগরিককে ঠেলে পাঠানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর প্রায় ২৫ ঘণ্টা পর শনিবার সকালে বিএসএফ সদস্যরা তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিন দিন পর ফিরিয়ে নেওয়া হলো ২৮ জনকে
চাঁপাইনবাবগঞ্জ (Chapainawabganj)-এর বাংগাবাড়ি সীমান্তে তিন দিন আগে পুশইনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক শূন্যরেখায় অবস্থান করা ২৮ জনকে পরে বিএসএফ ফিরিয়ে নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।
এর আগে ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী এবং ৬ শিশু শূন্যরেখার জঙ্গল এলাকায় খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছিলেন। তবে তাদের সঙ্গে আনা মালপত্র এখনো ভারতীয় অংশে পড়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।
পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও সীমান্তে মানবিক সংকট
পঞ্চগড় (Panchagarh) সীমান্তে শূন্যরেখায় ১০ জন ভারতীয় নাগরিক এখনো অবস্থান করছেন। বিজিবি তাদের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দেওয়ার পর বিএসএফও তাদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
অন্যদিকে ঠাকুরগাঁও (Thakurgaon)-এর হরিপুর সীমান্তে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ ১১ জন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। বিজিবির বাধার কারণে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি, আবার ভারতীয় ভূখণ্ডেও পুরোপুরি ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
সিলেট ও শেরপুরেও প্রতিরোধ
সিলেট (Sylhet) সীমান্তে সম্ভাব্য পুশইন ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিশেষ মাইকিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়েছে বিজিবি। গোয়াইনঘাট সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় জনগণের সহায়তায় সন্দেহভাজন দুই ভারতীয় নাগরিককে আটক করার পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে শেরপুর (Sherpur) সীমান্তেও অবৈধ অনুপ্রবেশের একটি বড় ধরনের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করেছে বিজিবি। স্থানীয় জনগণের সহায়তায় শুক্রবার সংঘটিত এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া হয়।
সীমান্তজুড়ে চলমান এসব ঘটনার মধ্যে বিজিবি জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার জনগণের সহযোগিতা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

