যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এবং মাসুদ পেজেশকিয়ান (Masoud Pezeshkian)-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান (Iran)-এর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তার রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি কতটা গভীর হতে পারে, সেই চিত্রই এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই সংঘাতের ফলে ইরান ও লেবানন (Lebanon)-এ হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের বড় একটি অংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। অন্যদিকে কৌশলগত হিসাব-নিকাশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল (Israel) প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। যে শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল বা ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে অভিযান শুরু হয়েছিল, তেহরানের সেই সরকার শেষ পর্যন্ত টিকে গেছে এবং অনেকের মতে আগের তুলনায় আরও শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছে।
সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি ছিল হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওয়াশিংটনের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ট্রাম্প প্রশাসনকে বড় ধরনের ছাড় দিতে বাধ্য হতে হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এবং ইসরায়েলি সরকার—উভয় পক্ষের মধ্যেই অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সমঝোতা স্মারকে লেবাননের যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো হলেও ইসরায়েল সে অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয়। তারা লেবাননে পূর্ণ সামরিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে আগ্রহী।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার করবে, তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে। এর ফলে ইরানের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ সংঘাত ও ক্ষয়ক্ষতির পর পরিস্থিতি আবারও যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। ২৭ ফেব্রুয়ারির আগে যেমন হরমুজ প্রণালি খোলা ছিল এবং পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল, এখন আবার সেই আলোচনার টেবিলেই ফিরছে দুই দেশ।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন (Antony Blinken) এক্সে মন্তব্য করেন, যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল হচ্ছে হরমুজ প্রণালির পুনরায় উন্মুক্ত হওয়া—যা যুদ্ধের আগেও খোলা ছিল। তার ভাষায়, সেই অবস্থায় ফিরতেও ইরানকে অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—যুদ্ধটি তাহলে কেন হয়েছিল?
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় ভুল হিসাব। একইসঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্যও এটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হয়ে দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রকে উৎসাহিত করে আসছিলেন। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে সরিয়ে দেওয়ার পর ইরানের ক্ষমতা কাঠামো ভেঙে পড়বে—এমন একটি ধারণা অনেকের মধ্যেই ছিল। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি।
খামেনির উত্তরসূরিরা দ্রুত বুঝতে পারেন যে এটি কেবল রাজনৈতিক সংঘাত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। সেই কারণেই তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পিছপা হয়নি। যে কৌশল খামেনি নিজে প্রয়োগ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন, সেটিই পরবর্তীতে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সবচেয়ে বড় চাপ সৃষ্টি করে।
সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর ইরানের প্রতিরোধ অক্ষ তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবুও হরমুজ প্রণালি বন্ধের মাধ্যমে তারা যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব সৃষ্টি করতে পেরেছে, তা অনেকের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প এটিকে ইরানের জনগণের জন্য ‘প্রজন্মে একবার আসা সুযোগ’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছিলেন যে এবার তথাকথিত সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটানো হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও কঠোরতার নানা অভিযোগ থাকলেও এটি দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় আদর্শ, জাতীয়তাবাদ এবং টিকে থাকার মানসিকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশকের ইরাক-ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এই ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চাপ ও সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
বর্তমান সমঝোতা কোনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নয়। বরং এটি পারমাণবিক ইস্যুতে ৬০ দিনের নতুন আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আলোচনা সফল হলে নিষেধাজ্ঞা আরও শিথিল বা প্রত্যাহার করা হতে পারে। তবে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট এখনো গভীর। উভয় পক্ষের কট্টরপন্থীরা এই প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
তারপরও হাজারো প্রাণহানি, আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির বিপুল ক্ষতির তুলনায় এই সমঝোতাকে অনেকেই ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। এখন নজর থাকবে আলোচনার টেবিলে—দুই পক্ষ কতটা বাস্তববাদী অবস্থান নেয় এবং কতটা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে এগোতে পারে।
তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে: শেষ পর্যন্ত যদি যুদ্ধের আগের অবস্থাতেই ফিরে যেতে হয়, তাহলে এত রক্তপাত, ধ্বংস এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রয়োজন ছিল কি? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।


