মাদক বিস্তার, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, রাজনৈতিক ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খু’\নোখু’\নি, একের পর এক নৃ’\শংস হ’\ত্যাকা’\ণ্ড, ধ’\র্ষণ, ডা’\কাতি, ছি’\নতাই এবং প্রকাশ্যে কো’\পাকু’\পির মতো ঘটনায় উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। রাতের আঁধারে অ’\পহরণ থেকে শুরু করে নানা ধরনের অপরাধের খবর প্রায় প্রতিদিনই সামনে আসছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনো অপরাধের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে খোদ পুলিশের ওপরই চড়াও হচ্ছে বিক্ষুব্ধ জনতা।
এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ভিডিওগুলোর অনেকটিতেই শোনা যাচ্ছে—“বিচার হবে না, আমরা বিচার করব।” ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ছে। রাজধানীর কিছু এলাকাতেও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতির আশা থাকলেও বাস্তবে খু’\ন, ডা’\কাতি, ছি’\নতাই ও অ’\পহরণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। মাঠপর্যায়ে পুলিশের মধ্যে ভীতি ও দ্বিধা কাজ করছে বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এর পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের খোয়া যাওয়া ১ হাজার ৩২৮টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশের দাবি, সদস্যদের মনোবল বাড়াতে বিভিন্ন মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে যানবাহন ও অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগও চলছে। তবে অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক অস্থিরতা, বিচারহীনতা ও নানা কাঠামোগত সমস্যার সমাধান ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর (Police Headquarters)-এর এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসেন (AHM Shahadat Hossain) বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka)-এর সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক (Towhidul Haque) মনে করেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শা’\স্তির ব্যবস্থা না হওয়ায় অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। তার মতে, শা’\স্তি কার্যকরে বিলম্ব এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে সংশয় তৈরি হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার মাসে ১ হাজার ২০২ জন খু’\নের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ছি’\নতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ৫৯৬টি, ডা’\কাতি ১৬০টি এবং অ’\পহরণের ঘটনা ১৯৫টি।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (Human Rights Support Society-HRSS)-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মে মাসে মব সহিংসতায় ৩১ জন নি’\হত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন। ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় নি’\হত হয়েছেন পাঁচজন এবং আহত হয়েছেন ২৮৯ জন। একই সময়ে ৩০৫ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৭৬ জন নারী ও শিশু এবং সংঘবদ্ধ ধ’\র্ষণের শিকার হয়েছেন ১৭ জন।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (Dhaka Metropolitan Police)-এর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে ২১ জন, মার্চে ২৪ জন, এপ্রিলে ১৭ জন এবং মে মাসে ১৬ জন খু’\নের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে ধ’\র্ষণের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে অব্যাহত রয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (Ain o Salish Kendra)-এর তথ্য বলছে, বছরের প্রথম তিন মাসেই ১২৮ নারী ও শিশু ধ’\র্ষণের শিকার হয়েছেন। মার্চ মাসেই এ সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৬১।
আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক আলোচিত হ’\ত্যাকা’\ণ্ড ঘটেছে। চট্টগ্রামের রাউজানে প্রকাশ্যে গু’\লি করে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে হ’\ত্যা করা হয়। খুলনায় পৃথক ঘটনায় গু’\লি ও কু’\পিয়ে হ’\ত্যা করা হয়েছে কয়েকজনকে। রাজধানীর নিউ মার্কেট, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকাতেও আলোচিত হ’\ত্যাকা’\ণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
সামাজিক অপরাধের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে ভয়াবহ চিত্র। রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধ’\র্ষণের পর হ’\ত্যার অভিযোগ ওঠে। মুগদা থেকে উদ্ধার করা হয় সাত টুকরো করা এক ব্যক্তির মরদেহ। ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় নৃ’\শংস হ’\ত্যাকা’\ণ্ড দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বাড়ছে। মিরপুরে বস্তি উচ্ছেদ অভিযানে গেলে পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়। মোহাম্মদপুরে ছি’\নতাইকারীদের ধরতে গিয়ে হামলার মুখে পড়েন পুলিশ সদস্যরা। আদাবর ও লালমনিরহাটের আদিতমারীতেও পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
খোয়া যাওয়া অস্ত্র এখনো বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ৩২৮টি এখনো উদ্ধার হয়নি। একই সময়ে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদেরও একটি বড় অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
এ অবস্থায় পুলিশের মনোবল ও অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরজুড়ে মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হবে। পাশাপাশি পুলিশের জন্য ২১২টি ডাবল কেবিন পিকআপ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮২ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
পুলিশের ভাষ্য, নতুন যানবাহন যুক্ত হলে টহল, অভিযান, অপরাধ দমন এবং জরুরি সাড়াদান কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু লজিস্টিক সহায়তা নয়, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই পরিস্থিতি উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।
