বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীনের তৈরি ২০টি জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টিরোল ফাইটার জেট সংগ্রহের পরিকল্পনা দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামরিক সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নানা বিশ্লেষণ সামনে আসছে।
প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া (Defense Security Asia) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, নয়াদিল্লির একটি অংশ এই চুক্তিকে শুধু যুদ্ধবিমান কেনার বিষয় হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলগত বাস্তবতার অংশ হিসেবেও দেখছে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই ক্রয়প্রক্রিয়া গতি পায়। পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারও বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ বাংলাদেশ (Bangladesh) ও চীন (China)-এর প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও গভীর করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ পরিকল্পনার আওতায় পুরোনো এফ-৭ এবং সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প হিসেবে নতুন প্রজন্মের ফাইটার জেট সংগ্রহের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার এবং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চাহিদা পূরণে উন্নত যুদ্ধবিমানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তির অর্থ দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় শুধু যুদ্ধবিমান নয়, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, লজিস্টিকস সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে এসব বিমান সরবরাহের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় রয়েছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় ঘাঁটিগুলোতে আধুনিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগকারী শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জে-১০সিই একটি ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। এটি অত্যাধুনিক অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (AESA) রাডার, উন্নত ডেটা লিংক এবং দূরপাল্লার এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র বহনের সক্ষমতায় সজ্জিত। আধুনিক নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেও এটি কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের একটি বড় অংশ চীন থেকে সংগ্রহ করা হয়। সাবমেরিন, ট্যাংক, মিসাইল ব্যবস্থা ও নৌসামরিক সরঞ্জামের পর উন্নত যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, বাণিজ্য, ট্রানজিট এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ একদিকে নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিভিন্ন শক্তিধর দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলও অনুসরণ করছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, জে-১০সিই সংগ্রহের উদ্যোগ শুধু বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্ন নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিবেশ, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আলোচনাকেও নতুন মাত্রা দিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে এই চুক্তির বাস্তবায়ন আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।
