হিজাব না পরে অনলাইন কনসার্টে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ইরানি সঙ্গীতশিল্পী পারাস্তু আহমাদি (Parastoo Ahmadi)-কে ৭৪টি বেত্রাঘাতের নির্দেশ দিয়েছেন ইরানের একটি আদালত। দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আহমাদি এবং তার প্রযোজনা দলের আট সদস্য—যাদের মধ্যে আরও কয়েকজন শিল্পী ছিলেন—২০২৪ সালে ইউটিউবে লাইভস্ট্রিম করা একটি কনসার্টে অংশ নেওয়ার কারণে এই শাস্তির মুখে পড়েছেন।
ইরান (Iran)-এর কোম প্রদেশের একটি ফৌজদারি আদালত এ রায় দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট শিল্পীদলের সদস্যদের ৭৪ বেত্রাঘাতের পাশাপাশি দুই বছরের জন্য দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং শিল্প ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে দুই বছরের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে তারা অশালীন ও অনৈতিক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করেছেন, যা জনশালীনতার পরিপন্থী বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ইরানের বিচার বিভাগের সংবাদ সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে এই রায় প্রকাশ করেনি।
মানবাধিকার সংগঠন এবং আইনজীবীদের মতে, ঘটনাটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক বা আইনি বিতর্ক নয়; বরং এটি দেশটিতে শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমনের বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। এ বিষয়ে সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান (Center for Human Rights in Iran)-এর বেহার ঘান্দেহারি বলেন, হিজাব ছাড়া গান গাওয়া এবং প্রকাশ্যে পারফর্ম করার কারণে এ ধরনের শাস্তি প্রমাণ করে যে দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতিতে এখনো কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানি কর্তৃপক্ষ যুদ্ধকালীন প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নত করার চেষ্টা করলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। মানবাধিকার পরিস্থিতির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিক মাসিহ আলিনেজাদ (Masih Alinejad) বলেন, এই পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে ইরানে নারীদের কণ্ঠকে কতটা হুমকি হিসেবে দেখা হয়। তিনি এটিকে নারীদের বিরুদ্ধে এক ধরনের বর্ণবাদমূলক ব্যবস্থা বলেও অভিহিত করেন।
মানবাধিকার আইনজীবী মোইন খাজেলি বলেন, ইরানের বিদ্যমান আইনে নারীকে গান গাওয়া বা সংগীত পরিবেশন করাকে অপরাধ হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এ ধরনের রায়ের আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অন্যদিকে, ইরানি-ব্রিটিশ অভিনেত্রী নাজানিন বনিয়াদি (Nazanin Boniadi) এই রায়ের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ইরানে দমন-পীড়ন এখনো অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন বা সংস্কারের আলোচনা সামনে এলেও বাস্তবে সাধারণ নাগরিক ও শিল্পীদের জন্য পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
জানা যায়, পুরো ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। সে সময় আহমাদি ‘মাতৃভূমির তরুণদের রক্ত থেকে’ শিরোনামের একটি দেশাত্মবোধক গান অনলাইনে পরিবেশন করেন। সেই পরিবেশনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে তার এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পীদলের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়, যার পরিণতিতে আদালতের এই রায় এসেছে।


