বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত (Bangladesh-India Border) ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে শেখ হাসিনার আমলে সই হওয়া বিতর্কিত চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ কার্যত থমকে গেছে। গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তিটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
জানা গেছে, চুক্তিটি নিয়ে বর্তমান সরকার বেশ অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় সরকার এটি বাতিলের পথে এগোবে, নাকি আগের মতো বহাল রাখবে—এ নিয়ে এখনো স্পষ্টতা তৈরি হয়নি। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (Salahuddin Ahmed)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নিয়ে শেখ হাসিনা আমলের সমঝোতা স্মারককে দেশবিরোধী হিসেবে দেখছেন দেশের ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন চুক্তি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী। ভারতকে একতরফা সুবিধা দিয়ে করা কোনো চুক্তি বহাল থাকলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে বলেও তারা মনে করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (Border Guard Bangladesh) এবং সরকারের একাধিক সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ৪১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ৩২৭১ কিলোমিটারজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শেষ করেছে ভারত। ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত এ নির্মাণকাজ চলে। বিডিআর হ’\ত্যাকা’\ণ্ডের পর নিরাপত্তার অজুহাতে সীমান্তজুড়ে বেড়া নির্মাণে ভারত আরও সক্রিয় হয়। কোথাও কোথাও শূন্যরেখাতেও বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রের দাবি, অবশিষ্ট ৮৮৫ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে ভারতীয় পক্ষ সীমান্তে চাপ প্রয়োগ করছে। বিজিবি ও সীমান্ত এলাকার মানুষ বাধা দিলে বিএসএফ শেখ হাসিনার আমলে হওয়া চুক্তির রেফারেন্স দেখাচ্ছে। কখনো কখনো এ নিয়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।
যেভাবে সামনে আসে চুক্তির বিষয়টি
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত অধিশাখার কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ-ভারত যুগ্ম সীমান্ত নির্দেশাবলি-১৯৭৫ অনুযায়ী, দুই দেশের শূন্যরেখার ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একইভাবে উন্নয়নমূলক কোনো কাজ করতেও পারস্পরিক সম্মতির বাধ্যবাধকতা আছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত-সংক্রান্ত রীতিতেও বিষয়টি একইভাবে বিবেচিত।
মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর কয়েক মাস ভারত সীমান্তে জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত ছিল। ওই সময়ে সীমান্ত হ’\ত্যা ছিল শূন্যের কোটায়। তবে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের চৌকা-সুখদেবপুর সীমান্তে বিএসএফ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে এলে বিজিবি শক্তভাবে বাধা দেয়। কয়েক দিনের ব্যবধানে কুড়িগ্রাম ও নওগাঁসহ পাঁচটি পয়েন্টে একই ধরনের চেষ্টা হয়।
বিজিবির বাধার মুখে বিএসএফ ২০১০ সালে শেখ হাসিনা সরকারের করা একটি চুক্তির কথা তুলে ধরে। তাদের বক্তব্য ছিল, তিনবিঘা এলাকায় ওই চুক্তির ভিত্তিতেই ভারত শূন্যরেখায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে। অথচ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এটি ১৯৭৫ সালের বাংলাদেশ-ভারত যুগ্ম সীমান্ত নির্দেশাবলি এবং আন্তর্জাতিক রীতির সরাসরি লঙ্ঘন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিজিবির তথ্যের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায়। পরে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। সে সময় তিনি তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করেন।
চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত ঝুলে যায়
শেখ হাসিনার সময়ে সীমান্ত নিয়ে হওয়া চুক্তি, সমঝোতা স্মারকসহ সংশ্লিষ্ট দলিলগুলো পর্যালোচনা করে বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছিলেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সীমান্তে বেড়া দেওয়া নিয়ে যেসব অসম সমঝোতা চুক্তি হয়েছে, সেগুলো বাতিলের বিষয়ে ভারতকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
তবে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি কেন—এ প্রশ্নে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, পিলখানায় বিডিআর হ’\ত্যাকা’\ণ্ডের পর নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে বেশি প্রভাব খাটায়। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনবিঘায় শূন্যরেখায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়। এ জন্য ভারত ওই সরকারের সঙ্গে চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই করেছে বলে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। ওই কর্মকর্তার মতে, এমন চুক্তি একটি স্বাধীন দেশের জন্য চরম অবমাননাকর।
কাঁটাতারের বেড়ার পক্ষে ভারতের ব্যাখ্যা
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং শেখ হাসিনা আমলের চুক্তির বিষয়ে জানতে চায়। জবাবে ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো ‘ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া’ শিরোনামে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, দুই দেশের সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪০৯৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩২৩২ দশমিক ২১৮ কিলোমিটার বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে ভারত দাবি করে, সীমান্তে বেড়া নির্মাণের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান ও অপরাধীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। পাচার রোধ ও অপরাধমুক্ত সীমান্ত নিশ্চিত করতেও এটি প্রয়োজন বলে জানানো হয়।
ভারত আরও জানায়, বাংলাদেশের সঙ্গে সব প্রটোকল ও চুক্তি মেনেই সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বেড়া নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দিল্লি এ বিষয়ে ঢাকাকে অবহিত করেছে বলেও দাবি করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ৮৬৪ দশমিক ৪৮২ কিলোমিটার এখনো বেড়াবিহীন। এর মধ্যে ১৭৪ কিলোমিটারে বেড়া নির্মাণ অসম্ভব; কারণ সেখানে জমি অধিগ্রহণ সমস্যা, জলাভূমি এবং কিছু এলাকায় বিজিবির আপত্তি রয়েছে।
গোপন চুক্তি প্রকাশ ও বাতিলের দাবি
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ (Mahbub Ullah) বলেন, ভারতের সঙ্গে বিগত শেখ হাসিনা সরকার এমন অনেক চুক্তি করেছে, যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। এসব চুক্তি জাতীয় স্বার্থে প্রকাশ করা জরুরি। একইসঙ্গে জনস্বার্থবিরোধী ও দেশবিরোধী চুক্তিগুলো দ্রুত বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো ভারতের প্রতি এ সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের দায়বদ্ধতা দেশ ও জনগণের প্রতি। সেই জায়গা থেকেই বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান (A L M Fazlur Rahman) বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও ১৯৭৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী ভারত কোনোভাবেই শূন্যরেখার ১৫০ গজের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণ করতে পারে না। দেড়শ গজের বাইরেও কোনো বেড়া বা স্থাপনা নির্মাণের আগে বাংলাদেশকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তার মতে, ভারত যদি কোনো সমঝোতা স্মারকের কথা বলে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বা অন্য স্থাপনা নির্মাণ করে থাকে, সেটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এমন কোনো চুক্তি সই হয়ে থাকলেও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে তার কার্যকারিতা থাকতে পারে না।
চুক্তি বাতিলের বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, খতিয়ে দেখে এ বিষয়ে বলা যাবে।
