চাঁদাবাজির অভিযোগে আটকের পর রাতেই মুক্ত এমপিপুত্র সজীব, তদবির নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক হয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুক্তি পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান (Azharul Islam Mannan)-এর ছেলে খাইরুল ইসলাম সজীব (Khairul Islam Sajib)। গত রোববার গভীর রাতে মুচলেকা নিয়ে তাকে পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শফিকুল ইসলাম (Shafiqul Islam), ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি)।

সজীবকে আটক এবং পরবর্তী সময়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। ডিবি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে একটি শিল্পগ্রুপের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল। সংশ্লিষ্ট গ্রুপটির কারখানা, অফিস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত। অভিযোগটি লিখিতভাবে জেলা পুলিশের কাছে দেওয়া হয়েছিল।

ওই অভিযোগের ভিত্তিতে বসুন্ধরায় নিজ বাসভবন থেকে সজীবকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয় এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পরে ডিবি কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

এদিকে আটকের পরপরই যুবদল (Jubo Dal)-এর নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে সজীবকে বহিষ্কার করা হয়।

এ বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, সজীবের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ ছিল এবং সেসব বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো নতুন মামলা ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের কিছু মামলায় তিনি জামিনে ছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে মুক্ত করতে কোনো তদবির হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “তাকে ছাড়াতে কেন কেউ তদবির করবে?”

ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, সজীব মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকলেও কোনো সক্রিয় মামলা না থাকায় তাকে আটক রাখার সুযোগ ছিল না। ফলে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মুচলেকার ভিত্তিতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, মুচলেকা গ্রহণের আইনি ভিত্তি রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৬ ও ১০৭ ধারায় আদালত এবং পুলিশ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মুচলেকা নিতে পারে বলে উল্লেখ আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির আরেক কর্মকর্তা দাবি করেন, সজীবের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পুলিশের কাছে ছিল। তবে তিনি একজন ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যের ছেলে হওয়ায় অভিযোগকারীরা মামলা করার সাহস পাননি। অভিযোগ অনুযায়ী, সজীবের ঘনিষ্ঠরা বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল।

সূত্রগুলো আরও দাবি করেছে, বিভিন্ন কারখানার পণ্যবাহী যানবাহন আটকে অর্থ আদায় এবং ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেও সজীবের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, চাহিদামতো অর্থ না পেলে পণ্য পরিবহনেও বাধা সৃষ্টি করা হতো।

ডিবি সূত্র জানায়, মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে সজীবকে আনার পর থেকেই সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তির যাতায়াত বেড়ে যায়। তাকে মুক্ত করার জন্য নানামুখী তদবির শুরু হয়। বিষয়টি একাধিক মন্ত্রী, আইজিপি এবং ডিএমপির ঊর্ধ্বতন পর্যায় পর্যন্ত গড়িয়েছে বলেও সূত্রের দাবি।

একই সূত্রের ভাষ্য, কুমিল্লার এক রাজনৈতিক নেতার তৎপরতা বিশেষভাবে নজরে আসে। তিনি রাতে একাধিকবার ডিবি কার্যালয়ে যান এবং বিভিন্ন স্থানে ফোনালাপ করেন। এসব তদবিরের প্রভাবেই শেষ পর্যন্ত সজীবকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।

ডিবি পুলিশ সূত্র আরও জানায়, যেসব ব্যক্তি সজীবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন, তাদেরও সেদিন রাতে ডিবি কার্যালয়ে ডাকা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয় কেন তারা আনুষ্ঠানিক মামলা করেননি। তবে তারা এ বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তারা শুধু দাবি করেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য কঠোর পুলিশি নজরদারি নিশ্চিত করা হোক। পরে ডিবি সজীবকে মুচলেকা নিয়ে মুক্তি দেয়।