দুবাইয়ে গোপনে চতুর্থ বিয়ে, বিতর্কে পলাতক সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সবুর লিটন

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (United Arab Emirates) দুবাইয়ে পলাতক অবস্থায় বিলাসবহুল আয়োজনের মধ্য দিয়ে গোপনে চতুর্থ বিয়ে করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (Chattogram City Corporation) সাবেক প্যানেল মেয়র ও ২৫ নম্বর রামপুরা ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সবুর লিটন (Abdus Sabur Liton)। সম্প্রতি তার বিয়ের অনুষ্ঠানের একাধিক ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।

দলটির অনেক নেতাকর্মী বলছেন, যেখানে দেশে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা আত্মগোপনে কিংবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, সেখানে হালিশহর থানা আওয়ামী লীগের (Halishahar Thana Awami League) সভাপতি আব্দুস সবুর লিটন দুবাইয়ে চতুর্থবারের মতো বিয়ে করে বিলাসী জীবনযাপন করছেন। তাদের ভাষায়, এই ঘটনা কর্মীদের আবেগে শুধু আঘাতই করেনি, বরং বিস্ময়ও তৈরি করেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আনুগত্য, মাঠের কর্মীদের ঝুঁকি আর বিদেশে নেতার এমন আয়েশি জীবন—সব মিলিয়ে ক্ষোভের আগুন আরও ছড়িয়ে পড়েছে।

এর আগেও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন আওয়ামী লীগের এই নেতা। দেশে দুই বোনকে একসঙ্গে বিয়ে করে তিনি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে দীর্ঘদিন সংসার করার পর এক স্ত্রীকে তালাক দিয়ে সম্পর্কচ্ছেদ করেন। শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, সিগারেটের অবৈধ ব্র্যান্ডরোল এবং বিভিন্ন নকল বিদেশি সিগারেট তৈরির ব্যবসার অভিযোগ ঘিরেও দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত ছিলেন তিনি।

জানা যায়, আব্দুস সবুর লিটন হালিশহরের রামপুরার রঙ্গীপাড়ার সালেহ জহুরের বোন বেবি আক্তার ও সুমি আক্তারকে ২০০৪ সালে একসঙ্গে বিয়ে করেন। সে সময় এমন নজিরবিহীন বিয়ে নিয়ে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। হালিশহরের বাসিন্দাদের ভাষ্য, ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী একই মায়ের গর্ভজাত দুই বোনকে একসঙ্গে স্ত্রী হিসেবে রাখা সম্পূর্ণ হারাম হওয়া সত্ত্বেও লিটন দুই বোনকে একসঙ্গে বিয়ে করেন। তখন এলাকাবাসী তীব্র সমালোচনা করলেও তিনি কারও কথায় কর্ণপাত করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

একটি সূত্র জানায়, প্রায় এক বছর আগে দুবাইয়ের একটি হোটেলে এক বাংলাদেশি তরুণীকে বিয়ে করেন আব্দুস সবুর লিটন। এটি তার চতুর্থ বিয়ে। এর আগে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে নগরের উত্তর কাট্টলীর স্থায়ী বাসিন্দা এক হিন্দু তরুণীকে বিয়ে করেন লিটন। ওই তরুণী চট্টগ্রামের একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক শেষ করেন। পাশাপাশি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল (Mohibul Hasan Chowdhury Nowfel) গ্রুপের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটিতেও তার পদ ছিল বলে জানা গেছে।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ওই তরুণী কিংবা তার পরিবারের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখেননি আব্দুস সবুর লিটন। জানা যায়, ওই তরুণী চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ডামি এমপি এস এম আল মামুনের (S M Al Mamun) হয়ে গণসংযোগ করেছিলেন।

সম্প্রতি বিয়ের কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ছবিতে দেখা যায়, বর বেশে আব্দুস সবুর লিটন শেরোয়ানি পরেছেন এবং বধূ বেশে থাকা তরুণীকে জড়িয়ে নানা ভঙ্গিতে ছবি তুলেছেন। কয়েকটি ছবিতে লিটন ও ওই তরুণীকে একই রঙের শেরোয়ানি ও থ্রি-পিস পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। আরও কিছু ছবিতে কেক কাটা এবং ফুল বিনিময়ের দৃশ্যও দেখা গেছে।

ফেসবুকে ইসমাঈল হোসেন নামে একজন লিখেছেন, ১৭ বছর ধরে লুট করা টাকায় এমন আয়েশি জীবন পরিচালনা করা সম্ভব। মো. ইমন নামে আরেকজন লিখেছেন, ইয়াবা ব্যবসা আর জনগণের টাকা চুরি করে বিদেশে তৃতীয় বিয়ে করেছেন লিটন। বিচার দূরে থাক, উল্টো আয়েশে আছেন তিনি। এসব মন্তব্যে শুধু রাজনৈতিক ক্ষোভ নয়, কর্মী-সমর্থকদের হতাশা ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরপরই ভারতে গা ঢাকা দেন আব্দুস সবুর লিটন। কিছুদিন সেখানে থাকার পর তিনি চলে যান দুবাইয়ে। সেখানে গত বছরের মাঝামাঝি ওই তরুণীকে বিয়ে করেন বলে সূত্রের দাবি। সম্প্রতি বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে তাদের এক শুভাকাঙ্ক্ষী কেক কাটার ছবি পোস্ট করলে বিয়ের পুরোনো ছবিগুলোও সামনে চলে আসে। যদিও লিটনের চতুর্থ স্ত্রীর নাম-পরিচয় জানা যায়নি।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন আব্দুস সবুর লিটন—এমন অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার বিশাল কিশোর গ্যাং ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনী জুলাই আন্দোলনে বহু শিক্ষার্থীকে গু’\লি করে। সেই প্রেক্ষাপটেই দুবাইয়ে তার বিলাসী জীবনযাপন ও নতুন বিয়ের ছবি ভাইরাল হওয়ায় রাজনৈতিক মহল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।