আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচের বিতর্কে মুখ খুলল ফিফা, রেফারিদের স্বাধীনতার পক্ষে কোলিনার জোরালো অবস্থান

আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর বহুল আলোচিত ম্যাচে রেফারিং নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর এবার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে ফিফা (FIFA)। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কোলিনা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ম্যাচ কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং কোনো ধরনের বাহ্যিক প্রভাবের সুযোগ সেখানে নেই। তার বক্তব্য, “ফাউল মানেই ফাউল।” গোল হওয়ার আগে ঘটনাটি যত আগেই ঘটুক না কেন, ভিএআর সেটি শনাক্ত করলে রেফারিকে অবশ্যই জানানো হবে।

ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল মিসর (Egypt)। এরপর লিওনেল মেসি (Lionel Messi)-র নেতৃত্বে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা (Argentina)। তবে মিসরের একটি গোল বাতিল হওয়া এবং ম্যাচের শেষদিকে পেনাল্টির দাবি নাকচ করে দেওয়াকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন কোচ হোসাম হাসান ও মিসরের খেলোয়াড়রা। তারা রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে এবং ভিএআরের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

ফিফার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে কোলিনা বলেন, “বিশ্বকাপের আর মাত্র আটটি ম্যাচ বাকি। সামগ্রিকভাবে আমরা রেফারিংয়ের মান নিয়ে সন্তুষ্ট। এত অল্প সময়ে এত বেশি ম্যাচ পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় পরিকল্পনামতো নাও হতে পারে। তবে সেসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই ম্যাচ কর্মকর্তারা নিজেদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করেন।”

রেফারিদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতারও কড়া সমালোচনা করেন কোলিনা। তিনি বলেন, “রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু ভিত্তিহীন অভিযোগের কোনো জায়গা নেই। ম্যাচ কর্মকর্তাদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত নয়। অনেক সময় এমন অভিযোগ তাদের এবং তাদের পরিবারের জন্যও হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো (Gianni Infantino) পর্যন্ত রেফারিদের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেন না। কোলিনার ভাষায়, “রেফারিং কার্যক্রম কারও দ্বারা পরিচালিত হয়—এমন দাবি সঠিক নয়। এমনকি ফিফা সভাপতির পক্ষ থেকেও নয়। ম্যাচ কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং খেলোয়াড় ও কোচদের মতো তারাও প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেন।”

মিসরের বাতিল হওয়া গোলের ব্যাখ্যায় কোলিনা জানান, প্রতিটি গোলের আগে আক্রমণভাগের বল দখলের পুরো ধাপ (Attacking Possession Phase) ভিএআরের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। গোলের আগে কোনো ফাউল শনাক্ত হলে এবং সেটি গোলের সঙ্গে সম্পর্কিত হলে, রেফারিকে মাঠের পাশের মনিটরে গিয়ে ভিডিও দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে ঘটনাটি গোলের কত আগে ঘটেছে বা কত দূরে ঘটেছে, সেটি বিবেচনার বিষয় নয়।

বিতর্কিত ঘটনাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “মিসরের ১৯ নম্বর জার্সিধারী মারওয়ান আত্তিয়া স্পষ্টভাবে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন। আমাদের দৃষ্টিতে এটি ফাউল। মাঠের রেফারি সেটি না দেখলেও ভিএআর এমন পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে।”

ম্যাচের শেষদিকে মোহাম্মদ সালাহ ও হুলিয়ান আলভারেজের সংস্পর্শে মিসরের পেনাল্টির দাবির বিষয়েও ব্যাখ্যা দেন কোলিনা। তার মতে, “যদি কোনো ডিফেন্ডার আগে বল স্পর্শ করেন এবং এরপর স্বাভাবিক ফুটবলীয় সংস্পর্শ ঘটে, তাহলে সেটিকে ফাউল হিসেবে ধরা হয় না। ওই ঘটনাতেও রেফারি ও ভিএআর উভয়েই সেটিকে স্বাভাবিক ফুটবলীয় সংঘর্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।”

তবে কোলিনা স্বীকার করেন, ফুটবলে কিছু সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত বিচার-বিশ্লেষণের সুযোগ থাকেই। তারপরও পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে একই নীতির ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পেরে ফিফা সন্তুষ্ট বলেও জানান বিশ্বখ্যাত এই সাবেক ইতালিয়ান রেফারি।