হাসিনার মৃ’\ত্যুদণ্ড ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের রায়, তবু পরিবারের অধিকাংশ সম্পদ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে

মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃ’\ত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পত্তির একটি অংশ ক্রোক কিংবা বাজেয়াপ্ত করা হলেও অধিকাংশ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতেই রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal) এবং নিম্ন আদালত থেকে তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও অজ্ঞাত কারণে সেই নির্দেশ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাসিনাকে ফাঁ’\সির দণ্ডাদেশ দেওয়ার পাশাপাশি ভারতে পলাতক সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর স্থাবর ও অস্থাবর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ দিয়েছিল আইসিটি। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের (Anti-Corruption Commission) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার বিভিন্ন আদালত হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা (Sheikh Rehana), রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক এবং তাদের কয়েকজন নিকটাত্মীয়ের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ দেয়।

তবে অনুসন্ধানে পাওয়া চিত্র বলছে, আদালতের নির্দেশ আর বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে এখনো বড় ফারাক রয়েছে। গাজীপুরে টিউলিপের নামে গড়ে তোলা ‘টিউলিপ টেরিটরি’র মালিকানা শেখ পরিবারের হাতেই রয়েছে। তাদের নিয়োজিত ব্যক্তিরাই সম্পত্তিটি দেখভাল করছেন। রাজধানীর ধানমন্ডির আলোচিত ‘সুধা সদন’ ক্রোকের আদেশ দেওয়া হলেও বাড়িটি এখন কার্যত ভবঘুরে ও মা’\দকসেবীদের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে ব্যাংকের লকারে থাকা হাসিনার ৮৩২ ভরি স্বর্ণালংকার জব্দ করতে পেরেছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, রেহানার দেবর তারিক আহমেদ সিদ্দিকের নামে থাকা ৫২ বিঘা জমি জব্দের আদেশও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তবে আদালতের আদেশ অনুযায়ী রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (Rajdhani Unnayan Kartripakkha) অনুকূলে শেখ পরিবারের নামে বরাদ্দ করা ৬০ কাঠার প্লট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ১২৪টি হিসাবে থাকা বিপুল অঙ্কের অর্থ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩১টি হিসাবে থাকা ৩৯৪ কোটি ৬০ লাখ ৭২ হাজার টাকা জব্দ রয়েছে।

আদালতের নির্দেশ থাকার পরও হাসিনা ও রেহানার সম্পদ বাজেয়াপ্তের ক্ষেত্রে ঢিলেমি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন আইনজীবী ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তাদের মতে, এমন বিলম্ব ন্যায়বিচারের পথেও অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের।

‘সুধা সদন’ এখন পরিত্যক্ত, আসবাবপত্রও নেই

ধানমন্ডির ৫/এ সড়কের ৫৪ নম্বর বাড়িটি ‘সুধা সদন’ নামে পরিচিত। প্রায় ১৬ কাঠা জমির ওপর নির্মিত বাড়িটি ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরমাণুবিজ্ঞানী ওয়াজেদ মিঞার মৃ’\ত্যুর পর ভবনটির মালিকানা পান হাসিনা, জয় ও পুতুল। আইসিটির আদেশে বাড়িতে হাসিনার মালিকানাধীন অংশ এবং দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার একটি আদালতের নির্দেশে জয় ও পুতুলের অংশ ক্রোক করার কথা রয়েছে।

দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, হাসিনা মৃ’\ত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। জয় ও পুতুল যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নাগরিক এবং তারাও বিভিন্ন মামলার আসামি। এসব কারণেই দুদকের পক্ষ থেকে আদালতে বাড়িটি ক্রোকের আবেদন করা হয়েছিল।

কিন্তু আদালতের নির্দেশের পরও বাড়িটির সংরক্ষণ কিংবা তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমানে এটি পরিত্যক্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বাড়ির মালামাল ও আসবাবপত্র টোকাইরা নিয়ে গেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি না থাকায় একসময় শেখ পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ বাসভবন হিসেবে পরিচিত বাড়িটি এখন মা’\দকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।

ক্রোকের আদেশ হলেও কার্যকর হয়নি যেসব সম্পদ

২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ জাকির হোসেন গালিবের আদালত হাসিনার পরিবারের পাঁচ সদস্যের একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমি ক্রোকের আদেশ দেন।

আদেশে পুতুলের রাজধানীর বারিধারায় অবস্থিত চার কোটি ৯৮ লাখ টাকা মূল্যের একটি বাড়ি ক্রোকের কথা বলা হয়। একই সঙ্গে খুলনার দিঘলিয়ায় পুতুল ও জয়ের নামে থাকা ৮৭ দশমিক ৭০ শতাংশ জমি, রেহানা ও তার ছেলে ববি এবং মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকের নামে থাকা ৮৭ দশমিক ৭০ শতাংশ জমি এবং গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় রেহানার নামে থাকা ১৯ শতাংশ জমি ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আদালতের সেই আদেশ এখনো কার্যকর হয়নি। দুদকের আবেদনের ভিত্তিতে আদালত সম্পত্তিগুলো ক্রোকের নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

এ ছাড়া টিউলিপ সিদ্দিকের নামে গুলশানের ৭১ নম্বর সড়কের ১১ নম্বর ভবনে থাকা দুই হাজার ৪৩৬ বর্গফুট আয়তনের বি/২০১ নম্বর ফ্ল্যাটটি ক্রোকের আদেশ দেয় আদালত।

রেহানার নামে রাজধানীর সেগুনবাগিচার ৭৯ নম্বর হোল্ডিংয়ের ২০৬ নম্বর ফ্ল্যাট এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সফিপুরে থাকা ৮ দশমিক ৫ শতাংশ জমিও ক্রোকের তালিকায় রয়েছে।

ববির নামে রাজধানীর নিকেতনে সাততলা একটি বাড়ির চতুর্থ তলায় কার পার্কিংসহ এক হাজার ৯২০ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট এবং একই আয়তনের তৃতীয় তলার আরেকটি ফ্ল্যাট ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই এলাকার অন্য একটি ভবনে কার পার্কিংসহ দ্বিতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় এক হাজার ৮০০ বর্গফুট আয়তনের চারটি ফ্ল্যাটও ক্রোকের আদেশ দেয় আদালত।

দুদকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসব সম্পত্তি ক্রোক ও বাজেয়াপ্তের নির্দেশ থাকলেও এখন পর্যন্ত আদালতের আদেশ কার্যকর করা হয়নি। ফলে সম্পত্তিগুলোর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

অবরুদ্ধ ১২৪ ব্যাংক হিসাব

২০২৫ সালের ১১ মে ঢাকার একটি আদালত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা, তার ছেলে জয়, মেয়ে পুতুল, বোন রেহানাসহ তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মোট ১২৪টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়।

অন্য একটি আদেশে শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন বা সিআরআই, সূচনা ফাউন্ডেশন, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর এবং আবু সিদ্দিক মেমোরিয়াল ট্রাস্টের ব্যাংক হিসাবও অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আদালতের এই দুটি আদেশই কার্যকর হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধান দলের এক সদস্য জানান, দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধানে হাসিনা, রেহানা, জয়, পুতুল ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্টদের নামে থাকা ৩১টি ব্যাংক হিসাবে ৩৯৪ কোটি ৬০ লাখ ৭২ হাজার টাকার সন্ধান পাওয়া যায়। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই অর্থ অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, হাসিনা, রেহানা, জয়, পুতুল ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ওই ৩১টি হিসাবের অস্থাবর সম্পদ অন্যত্র হস্তান্তর, স্থানান্তর কিংবা বেহাত করার চেষ্টা করছিলেন বলে তথ্য পায় দুদক। এরপর বিপুল অঙ্কের অর্থ অবরুদ্ধ চেয়ে আবেদন করা হলে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ জাকির হোসেন গালিব তা মঞ্জুর করেন।

এ ছাড়া পুতুলের গুলশানের একটি ফ্ল্যাট জব্দ করা হয়েছে। সূচনা ফাউন্ডেশনের ১৪টি ব্যাংক হিসাবে গচ্ছিত ৪৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকাও অবরুদ্ধ রয়েছে। দুদকের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিপুল এই অর্থ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন।

শেখ পরিবারের নিয়ন্ত্রণেই ‘টিউলিপ টেরিটরি’

দুদকের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গাজীপুর মহানগর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে মৌচাকের তেলিরচালা এলাকায় ৩৫ বিঘা জমির ওপর টিউলিপ সিদ্দিকের নামে ‘টিউলিপ টেরিটরি’ গড়ে তোলা হয়।

এর বাইরে বাঙ্গালগাছ এলাকায় ২৫ বিঘা এবং ফাওকাল এলাকায় ২৩ বিঘা জমির ওপর রেহানার পরিবারের দুটি বাগানবাড়ি রয়েছে। রেহানার স্বামী ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক ও তাদের ছেলে ববির নামে আরও ২৩১ শতক জমির সন্ধান পেয়েছে দুদক।

দুদকের তথ্য বলছে, শফিক ও ববির নামে ১৮টি দলিলের মাধ্যমে বিপুল এই জমি কেনা হয়েছিল। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত এসব সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেন।

তবে সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, আদালতের নির্দেশের পরও সম্পত্তিগুলো রেহানা পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। তাদের নিয়োগ করা কেয়ারটেকাররা বাগানবাড়ি ও জমিগুলোর দেখভাল করছেন। আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে নেওয়ার দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি।

হাসিনার দুই লকারে ৮৩২ ভরি স্বর্ণ

আইসিটির রায়ে হাসিনার সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ কার্যকর করতে গিয়ে অগ্রণী ব্যাংকে তার নামে থাকা দুটি লকারের সন্ধান পায় দুদক।

দুদকের অনুসন্ধান দলের এক সদস্য জানিয়েছেন, লকার দুটি খুলে মোট ৮৩২ ভরি স্বর্ণালংকার পাওয়া গেছে। লকার খোলার সময় দুদকের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

দুদকের কর্মকর্তাদের দাবি, হাসিনা বিপুল পরিমাণ এই স্বর্ণ তার আয়কর বিবরণীতে উল্লেখ করেননি। ফলে তিনি সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন বলে মনে করছেন অনুসন্ধানকারীরা। লকার থেকে পাওয়া স্বর্ণালংকার এরই মধ্যে জব্দ করা হয়েছে।

তারিক সিদ্দিকের ৫২ বিঘা জমি এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে

হাসিনার সাবেক সামরিক নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রেহানার দেবর তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও তার স্ত্রী শাহীন সিদ্দিকের নামে গাজীপুরে ৫২ বিঘা জমির সন্ধান পাওয়া গেছে।

ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত এসব জমি জব্দের আদেশ দিয়েছিলেন। নথিতে জমিগুলোর মূল্য দেখানো হয়েছে ২৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা।

তবে আদালতের জব্দের নির্দেশ কার্যকর হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বর্তমানে এসব জমিও তারিক সিদ্দিক ও তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। আদেশ বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

রাজউকের ৬০ কাঠার প্লট বাজেয়াপ্ত

রাজউকের আলোচিত পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে নিজের নামে ১০ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ নিয়েছিলেন হাসিনা। শুধু তিনি নন, তার ছেলে জয়, মেয়ে পুতুল, ছোট বোন রেহানা এবং রেহানার দুই সন্তানও একই প্রকল্পে ১০ কাঠা করে প্লট পান।

সব মিলিয়ে শেখ পরিবারের ছয় সদস্যের নামে ৬০ কাঠা জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান বাজারমূল্যে প্রতিটি ১০ কাঠার প্লটের দাম প্রায় ১২ কোটি টাকা।

দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, এসব প্লটের তথ্যও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর বিবরণীতে দেখানো হয়নি। আদালতের নির্দেশের পর প্লটগুলোর বরাদ্দ বাতিল করে সেগুলো রাজউকের অনুকূলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সম্পত্তি ক্রোকের দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের

আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আদালত বা ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সম্পত্তি ক্রোক ও বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের।

আমার দেশকে তিনি বলেন, আইসিটি আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল যে কোনো মামলায় রায় দিতে পারে। তবে সেই রায় কার্যকর করার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর। রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশনের সরাসরি কিছু করার সুযোগ নেই।

তার ভাষ্য, আদালতের আদেশ ও রায়ের যাবতীয় নথিপত্র সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এখন সেগুলো কার্যকর করা সংশ্লিষ্ট নির্বাহী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কেও তিনি কিছু জানেন না।

দ্রুত আদেশ বাস্তবায়ন চান বিশিষ্টজনেরা

আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া বিলম্ব হলে সরকারের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তার মতে, এতে জুলাই হ’\ত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে সরকারের সদিচ্ছা সম্পর্কেও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

আমার দেশকে তিনি বলেন, জুলাই হ’\ত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে সরকারের মধ্যে কালক্ষেপণের একটি নীতি দেখা যাচ্ছে। এত বড় একজন খু’\নির বিষয়ে আদালত রায় দেওয়ার পর দ্রুত সেই আদেশ বাস্তবায়ন করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল। কিন্তু বাস্তবে গড়িমসি করা হচ্ছে। কী কারণে এমনটি হচ্ছে, তা সংশ্লিষ্টরাই ভালো জানেন।

তিনি বলেন, এই সরকারের মূল ভিত্তিই জুলাইয়ের শহীদেরা। তাই অন্য সবকিছুর আগে হ’\ত্যাকাণ্ডগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।

দিলারা চৌধুরীর মতে, পলাতক খু’\নিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ কার্যকরে আরও বিলম্ব হলে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হবে। একপর্যায়ে এটি গভীর সংকটেও রূপ নিতে পারে।

পলাতকদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (Transparency International Bangladesh) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদক নিজে উদ্যোগী হয়ে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং তার ভিত্তিতে আদালত সম্পত্তি জব্দের আদেশ দিয়েছেন। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক।

তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, এটি একটি বড় আইনি প্রক্রিয়ার কেবল একটি অংশ। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনের নির্মোহ প্রয়োগ হবে—এমন প্রত্যাশা সব সময় সহজ নয়।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে তারা ভিন্ন কোনো চিত্র দেখতে চান না। দেশের মানুষের মতো তারাও চান, অবৈধভাবে অর্জিত সব সম্পদ আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করে বাজেয়াপ্ত করা হোক।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এহসান আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, আইসিটির দেওয়া আদেশ বাস্তবায়ন অন্য সব বিষয়ের ওপর অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। এ ধরনের আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়া কাম্য নয়।

তার মতে, ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পলাতক হাসিনাসহ যাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাদের বিষয়ে কোনো ধরনের কালক্ষেপণ করা উচিত হবে না। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত তৎপরতা জরুরি।

তিনি বলেন, অনেক সময় সমসাময়িক সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যায়। তবে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় ও সামষ্টিক তৎপরতা থাকলে আদালতের আদেশ দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

শহীদ পরিবারগুলোর ক্ষোভ ও উদ্বেগ

আইসিটির তিনটি মামলায় হাসিনাসহ ছয় আসামির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দীর্ঘ সময়েও পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় শহীদ ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। আদেশ বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, এ বিষয়ে সরকারের উদাসীনতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দিপ্তী ক্ষোভ প্রকাশ করে আমার দেশকে বলেন, খু’\নিরা তার প্রিয়তম সন্তান আনাসসহ দেশের শত শত ছেলেমেয়েকে হ’\ত্যা করেছে। তারা হাজারো মায়ের বুক খালি করেছে। শহীদের মা-বাবারা সন্তান হারিয়ে দিশাহারা অবস্থায় বেঁচে আছেন, অথচ খু’\নিরা বিদেশে আরাম-আয়েশে জীবন কাটাচ্ছে।

তিনি বলেন, তাদের মৃ’\ত্যুদণ্ড হলেও এখনই তা কার্যকর করার সুযোগ নেই। অন্তত তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়িত হলে একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হতো। কিন্তু রায়ের পর সাত মাস পার হয়ে গেলেও সরকার এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এতে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। তারা এ বিষয়ে সর্বোচ্চ উদাসীনতা দেখতে পাচ্ছেন।

সানজিদা খান দিপ্তী আরও বলেন, সরকারের কাছে তার আবেদন—হাসিনাসহ খু’\নিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ যেন দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়। আন্দোলনে আ’\হত হাজার হাজার মানুষ অর্থের অভাবে চিকিৎসা নিতে পারছেন না। বাজেয়াপ্ত করা অর্থ যেন তাদের চিকিৎসায় ব্যয় করা হয়।

তিনি বলেন, তিনি তার কলিজার টুকরা আনাসকে হারিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে তার কিছু প্রয়োজন নেই। তার একমাত্র চাওয়া, পলাতক খু’\নিদের বিদেশ থেকে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করা হোক।

শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়াও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আমার দেশকে তিনি বলেন, এত দিন পার হওয়ার পরও সরকার কেন খু’\নিদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ কার্যকর করতে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না, শহীদ পরিবারগুলো তা জানতে চায়।

তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারের কাছে তাদের আবেদন, আদালতের দেওয়া আদেশ যেন আর বিলম্ব না করে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন গাজীপুরের স্টাফ রিপোর্টার নাসির আহমেদ ও খুলনা ব্যুরো প্রধান এহতেশামুল হক শাওন।