রামমূর্তি নির্মাণে আলোচনায় আসা হরিদাস চন্দ্র এবার অর্থপাচার মামলায় গ্রেফতার, তদন্তে নতুন তথ্য

গাইবান্ধায় উঁচু রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় আসা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস (Haridas Chandra Tarani Das) ওরফে তাওহীদ ইসলামকে অর্থপাচার ও প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার করেছে সিআইডি (CID)। সংস্থাটির দাবি, তার বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন, প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে তদন্ত চলছে।

সিআইডি জানিয়েছে, ১২ জুলাই গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর মন্দির এলাকা থেকে একটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। পরে উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। সোমবার আদালতের মাধ্যমে তাকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম হরিদাসের। গ্রেফতারের পর সিআইডি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, তিনি ২০০৬ সালে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে এইচএসসি পাস করেন। তবে পরদিন সংস্থাটি জানায়, ওই শিক্ষাগত তথ্য এখনো যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।

অন্যদিকে স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণির পরই পড়াশোনা ছেড়ে দেন হরিদাস। ২০০০ সালের দিকে ভারতে গিয়ে প্রায় নয় বছর অবস্থান করেন। সেখানে ইলেকট্রনিক্সের কাজ শেখার পর দেশে ফিরে ঢাকার উত্তরায় এসি মেকানিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে পুরোনো এসি বিক্রি ও মেরামতের ব্যবসার পাশাপাশি কিছু সময় সবজি বিক্রির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে তার আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয়। সিআইডির দাবি, ২০১৮ সালের পর তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতেন। ২০১৯ সালে বিয়ের পর ধর্মান্তরিত হয়ে নিজের নাম পরিবর্তন করে তাওহীদ ইসলাম রাখেন। পরে শ্বশুরের পরিচয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এলাকায় জমি কেনেন এবং স্থানীয়দের কাছে নিজেকে বিত্তশালী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন।

তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, চাকরি দেওয়ার আশ্বাস, বদলি করিয়ে দেওয়া, সরকারি টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বহু ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ছয় থেকে সাত বছরের মধ্যে প্রতারণার মাধ্যমে তিনি আনুমানিক আট কোটি টাকা সংগ্রহ করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই অর্থের একটি বড় অংশ দিয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় ‘প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক’ নামে একটি রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়।

তদন্তকারীদের দাবি, ওই রিসোর্টকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হতো। ২০২২ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মচারীর বদলি বাতিলে ভুয়া ডিও লেটার ব্যবহারের অভিযোগের তদন্তে তার নাম সামনে আসে। পরে রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব।

তবে ওই ঘটনার পরও তার কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ তদন্ত সংস্থার। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আবার পলাশবাড়ীতে সক্রিয় হন। নিজ ধর্মে ফিরে স্থানীয় একটি কালীমন্দির সংস্কার ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। পরে মন্দিরটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালীমন্দির’।

প্রথমে মন্দির প্রাঙ্গণে ৫১ ফুট উঁচু কৃষ্ণমূর্তি স্থাপন করা হয়। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেখানে ৮১ ফুট উঁচু রামমূর্তি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সে সময় সামাজিক মাধ্যমে হরিদাস দাবি করেছিলেন, প্রকল্পটিতে প্রায় ৪১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন ও অন্যান্য জটিলতার কারণে ১১ জুন মন্দির কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজ স্থগিত ঘোষণা করে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, মন্দিরকেন্দ্রিক একটি পরিকল্পিত বৃদ্ধাশ্রম প্রকল্পের সদস্যপদের নামে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১ হাজার ১ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এভাবে প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার ব্যক্তি সদস্য হয়েছেন বলেও স্থানীয়ভাবে দাবি করা হচ্ছে। তবে এ তথ্যের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।

সিআইডি জানিয়েছে, গত দেড় বছরে হরিদাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমা এবং একই পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, এই অর্থের বৈধ উৎসের প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান (Moniruzzaman) গণমাধ্যমকে বলেন, অস্বাভাবিক অর্থ লেনদেনের বিষয়ে হরিদাস দাবি করেছেন, তার ভক্তরা তাকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

তদন্তকারীদের ভাষ্য, একজন এসি মেকানিক থেকে অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে বিপুল অর্থ লেনদেনের পেছনে প্রকৃত উৎস কী ছিল, সেটিই এখন তদন্তের মূল বিষয়।