রেলের সব বিজ্ঞাপনে ১০ বছরের একক অধিকার চান জি কে শামীম, মন্ত্রীর ‘সহযোগিতা’ নির্দেশে তোলপাড়

বাংলাদেশ রেলওয়ের (Bangladesh Railway) সব স্টেশন, স্থাপনা, অবকাঠামো, প্ল্যাটফর্ম ও রোলিং স্টকে বিজ্ঞাপন স্থাপনের অধিকার টানা ১০ বছর এককভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চান কার্যক্রম নি’\ষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের (Bangladesh Awami Jubo League) আলোচিত নেতা এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম (G K Shamim)। এ বিষয়ে তাকে ‘প্রয়োজনীয় সহযোগিতা’ দিতে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে লিখিত নির্দেশ দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম (Sheikh Rabiul Alam)। রেল মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

বিতর্কিত ও নি’\ষিদ্ধ যুবলীগ নেতার এমন আবেদনের ওপর মন্ত্রীর লিখিত নির্দেশ ঘিরে রেলপথ মন্ত্রণালয়, রেলওয়ে সদর দপ্তর এবং এর অধীন বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, পুরো রেলওয়ের বিজ্ঞাপনব্যবস্থা এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে তুলে দেওয়ার আবেদন যেমন নজিরবিহীন, তেমনি সেই আবেদনে সহযোগিতার নির্দেশনাও অস্বাভাবিক। রুলস অব বিজনেস এবং রেলওয়ের বিজ্ঞাপন নীতিমালার আলোকে আবেদন ও নির্দেশনা—দুটিই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

তবে রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, প্রতিদিনই তার কাছে এ ধরনের অসংখ্য আবেদন আসে। সেগুলো আইন, নীতিমালা ও প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী নিষ্পত্তির জন্য তিনি সচিবের কাছে মার্ক করে পাঠিয়ে দেন। যুবলীগ নেতা জি কে শামীম কিংবা তার মনোনীত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে নিজের দূরতম সম্পর্কও নেই বলে দাবি করেছেন মন্ত্রী। তার ভাষ্য, সরল বিশ্বাসেই তিনি আবেদনটির ওপর প্রয়োজনীয় সহযোগিতার কথা লিখেছিলেন।

অন্যদিকে জি কে শামীমের এই আবেদনকে ‘সরকারের বিরুদ্ধে ষ’\ড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন বিএনপি ও যুবদলের নেতারা। বিষয়টি নিয়ে দল দুটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলেছে আমার দেশ। কার্যক্রম নি’\ষিদ্ধ যুবলীগ নেতার এমন আবেদনকে কীভাবে দেখছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই একটি গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে রেলওয়ের সব স্টেশন, কম্পার্টমেন্ট, প্ল্যাটফর্ম ও স্থাপনার বিজ্ঞাপনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য জি কে শামীমের আবেদন তাদের ব্যথিত করেছে।

তাদের বক্তব্য, যে সময়ে জি কে শামীমের বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শা’\স্তি হওয়ার কথা, ঠিক সেই সময়ে প্রভাব ও দাপট দেখিয়ে সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করার উদ্যোগ বিস্ময়কর। বিষয়টি শুধু একটি বাণিজ্যিক আবেদন নয়; বরং এর নেপথ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা সরকারকে বিতর্কিত করার চেষ্টা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

১০ বছরের একক অধিকার চেয়ে আবেদন

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জি কে শামীম তার মালিকানাধীন জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেডের পক্ষ থেকে গত ১১ জুন রেলমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। আবেদনপত্রে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

আবেদনে জি কে শামীম উল্লেখ করেন, জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেড একটি সরকারি তালিকাভুক্ত ‘স্পেশাল ক্লাস পিডব্লিউডি’ প্রকৌশল নির্মাণ, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক কাজ, সংযোগ ও স্থাপন এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ রেলওয়ের পুরো নেটওয়ার্কজুড়ে সব স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, রোলিং স্টক এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে একটি সমন্বিত বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন, স্থাপন, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করতে চায়।

এই কাজের জন্য আগামী ১০ বছর একক অধিকার চেয়েছেন জি কে শামীম। অর্থাৎ রেলওয়ের সব স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, রোলিং স্টক ও অন্যান্য স্থাপনায় বিজ্ঞাপন পরিচালনার অধিকার যেন শুধু তার প্রতিষ্ঠানকেই দেওয়া হয়—আবেদনে সেই অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

শুধু বিজ্ঞাপন পরিচালনার একক অধিকারই নয়, সেখানে স্থাপন করা বিজ্ঞাপনসামগ্রী ও যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতেও বাংলাদেশ রেলওয়েকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য মন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন তিনি। একই সঙ্গে জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানির প্রতিনিধিদের রেলওয়ের সব এলাকা ও স্থাপনায় প্রবেশের অধিকার নিশ্চিত করার অনুরোধও জানান।

জি কে শামীমের আবেদনে আরও বলা হয়েছে, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান যেন রেলওয়ের কোনো স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, রোলিং স্টক বা অবকাঠামোতে বিজ্ঞাপন স্থাপন করতে না পারে। এ জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও প্রার্থনা করেছেন তিনি। ফলে আবেদনটি অনুমোদিত হলে রেলওয়ের পুরো বিজ্ঞাপন খাত কার্যত একটি প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে চলে যেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ডায়েরিভুক্ত না করেই সচিবের দপ্তরে

রেলপথ মন্ত্রণালয় (Ministry of Railways) সূত্র জানিয়েছে, গত ১১ জুন জি কে শামীমের স্বাক্ষরিত আবেদনটি জমা দেওয়া হয়। চার দিন পর ১৫ জুন রেলমন্ত্রী আবেদনটির ওপর নির্দেশনা লিখে তা সচিবের কাছে পাঠান। আবেদনের ওপরে সচিবকে উদ্দেশ করে মন্ত্রী লেখেন, ‘প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করুন।’

তবে আবেদনটি মন্ত্রীর দপ্তরের নিয়মিত ডায়েরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে জানা গেছে। ডায়েরিভুক্ত না করেই সেটি সরাসরি সচিবের দপ্তরে পাঠানো হয়। পরে ১৭ জুন সচিবের দপ্তরের রেজিস্ট্রারে আবেদনটি ১২৯২ ক্রমিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এরপর রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবেদনটি পরীক্ষা ও নিষ্পত্তির জন্য মন্ত্রণালয়ের আইন ও ভূমি শাখায় পাঠিয়ে দেন। আবেদনটির আইনগত ভিত্তি, রেলওয়ের বিদ্যমান বিজ্ঞাপন নীতিমালা এবং উন্মুক্ত দরপত্রের বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের কাজ চলছে বলে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

টানা ১০ বছরের জন্য রেলওয়ের সব স্থাপনা, নেটওয়ার্ক, স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম ও রোলিং স্টক বিজ্ঞাপনের কাজে এককভাবে ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে জি কে শামীমের করা আবেদনটি নিয়ে এখন মন্ত্রণালয়ের ভেতরে তোলপাড় চলছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মন্ত্রীর ‘সহযোগিতা করুন’ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গেলে রেলওয়ের বিজ্ঞাপন নীতিমালা, প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

তবে মন্ত্রীর নির্দেশনা এবং বিদ্যমান বিধিবিধান—দুই দিক সামনে রেখেই আবেদনটির আইনগত দিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইন ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আবেদনটি কীভাবে নিষ্পত্তি করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়।

কর্মকর্তাদের মতে, আবেদনটিই বেআইনি

রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রেলওয়ের সব স্থাপনা টানা ১০ বছর এককভাবে ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে জি কে শামীম যে আবেদন করেছেন, সেটিই আইনসম্মত নয়। তাদের মতে, এমন আবেদন কোনোভাবেই সরাসরি গ্রহণ বা অনুমোদন করতে পারে না মন্ত্রণালয়।

কর্মকর্তারা জানান, ২০২৬ সালে প্রণীত রেলওয়ে বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ডিং নীতিমালা অনুযায়ী রেলওয়ের যে কোনো স্থাপনায় বিজ্ঞাপন প্রচারের অধিকার উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে দিতে হবে। আগ্রহী সব প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতার সুযোগ না দিয়ে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে এককভাবে কাজ দেওয়ার সুযোগ নীতিমালায় নেই।

নীতিমালায় বিজ্ঞাপনের জন্য প্রতি বর্গফুটের মূল্য ১২ হাজার টাকা নির্ধারণের নির্দেশনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাদের বক্তব্য, জি কে শামীমের আবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে বিজ্ঞাপন নীতিমালার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা উপেক্ষিত হবে। একই সঙ্গে সরকারি সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও সমান সুযোগের নীতিও ক্ষুণ্ন হবে।

রুলস অব বিজনেস অনুসরণ না করে বিভিন্ন আবেদনের ওপর মন্ত্রীদের দেওয়া নির্দেশনার কারণে অনেক সময় মন্ত্রণালয়ের সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া।

আমার দেশকে তিনি বলেন, মন্ত্রীরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ায় জনগণের অনেক ধরনের আবদার তাদের কাছে আসে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো বিবেচনার আশ্বাস দিতে হয়। কিন্তু এ ধরনের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর পড়ে। তখন আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে নির্দেশনার অসামঞ্জস্য থাকলে কর্মকর্তারা সমস্যায় পড়েন।

ফিরোজ মিয়ার মতে, যেখানে আইন, নীতিমালা ও বিধিবিধানের বিষয় জড়িত, সেখানে কোনো আবেদন এলে সেটি নির্ধারিত পদ্ধতি মেনেই নিষ্পত্তি করতে হয়। রেলওয়ের বিজ্ঞাপনের মতো বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান এবং আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের বিষয়ে কোনো মন্ত্রী নির্দেশ দিলেও তা রুলস অব বিজনেস এবং দেশের প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে কার্যকর করার সুযোগ নেই। তাই মন্ত্রীদেরও নির্দেশনা দেওয়ার সময় বিদ্যমান নিয়ম ও প্রক্রিয়ার প্রতি সতর্ক থাকা উচিত। তবে জনসেবামূলক কোনো কাজে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া দোষের নয় বলেও মনে করেন তিনি।

ফিরোজ মিয়ার ভাষ্য, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনবান্ধব নন—সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। সে কারণেই অনেক মানুষ সেবা বা সমস্যার সমাধানের জন্য সরাসরি রাজনীতিবিদদের কাছে যান। কিন্তু জনসেবা নিশ্চিত করা এবং সরকারি সম্পদ কোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার প্রশ্ন এক বিষয় নয়; দুই ক্ষেত্রেই আলাদা আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

জি কে শামীমকে ঘিরে পুরোনো প্রশ্ন

২০১৯ সালের ক্যা’\সি’\নোবিরোধী অভিযানের সময় জি কে শামীমের নাম দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। সে সময় তাকে যুবলীগের তৎকালীন বিতর্কিত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাটের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

রাজধানীর ক্যা’\সি’\নোকেন্দ্রিক অ’\বৈধ আয়ের একটি অংশ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে ভাগাভাগি হতো—এমন অভিযোগের সঙ্গে জি কে শামীম ও সম্রাটের নামও উঠে আসে। তবে জি কে শামীমের সবচেয়ে আলোচিত পরিচয় ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তরের টেন্ডার ব্যবসায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তি হিসেবে।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-প্রচার সম্পাদক পরিচয় ব্যবহার করে তিনি একের পর এক বড় সরকারি নির্মাণ প্রকল্পের কার্যাদেশ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের দরপত্র ও নির্মাণকাজে তার প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, সংশ্লিষ্ট মহলে তাকে গণপূর্তের টেন্ডার ব্যবসার নিয়ন্ত্রক হিসেবেও দেখা হতো।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যা’\সি’\নোবিরোধী অভিযান শুরুর পর দেশের মানুষ প্রথমবারের মতো জানতে পারে, রাজধানীর কয়েকটি অভিজাত ক্লাবকে কেন্দ্র করে কীভাবে বিশাল অ’\বৈধ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল। সেই অভিযানের ধারাবাহিকতায় রাজধানীর নিকেতনে জি কে শামীমের বিলাসবহুল কার্যালয়ে অভিযান চালায় র‌্যাব।

সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া অ’\স্ত্র, নগদ অর্থ এবং অন্যান্য সম্পদের পরিমাণ দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার কার্যালয় থেকে আটটি আ’\গ্নে’\য়া’\স্ত্র, শত কোটি টাকার এফডিআর, বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা এবং বিদেশি মদ উদ্ধারের তথ্য জানানো হয়।

সাত দেহরক্ষীসহ জি কে শামীমকে গ্রে’\প্তার করার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, সরকারি কাজ ও টেন্ডারকে ঘিরে গড়ে ওঠা মা’\ফি’\য়া’\তন্ত্রের হয়তো অবসান হতে যাচ্ছে। এরপর তার বিরুদ্ধে একে একে অ’\স্ত্র, মা’\দক, চাঁ’\দা’\বা’\জি, দু’\র্নী’\তি ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা হয়।

এর মধ্যে অর্থপাচারের একটি মামলায় নিম্ন আদালত তাকে দ’\ণ্ডি’\ত করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত সেই রায় বাতিল করে তাকে খালাস দেন। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় আদালত তার হাজতবাসের সময়কে সাজার মেয়াদ হিসেবে বিবেচনা করায় ওই মামলাতেও তাকে আর কারাগারে রাখার সুযোগ ছিল না বলে কারা সূত্র আমার দেশকে জানিয়েছে।

এর আগে দুদকের অনুসন্ধানে জি কে শামীম ও তার মায়ের নামে প্রায় ২৯৭ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। এসব সম্পদের বড় একটি অংশের বৈধ উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি বলেও অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছিল।

ফোন ধরেননি, বার্তারও জবাব নেই

রেলওয়ের সব বিজ্ঞাপন ও স্থাপনা এককভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আবেদনের বিষয়ে জি কে শামীমের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে আমার দেশ। আবেদনে উল্লেখ করা মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কোনো কল রিসিভ করেননি।

তার মোবাইল নম্বরে খুদে বার্তাও পাঠানো হয়। বার্তা পাঠানোর পর তিন দিন অপেক্ষা করা হলেও জি কে শামীম কোনো জবাব দেননি। ফলে রেলওয়ের পুরো বিজ্ঞাপন খাত এককভাবে ব্যবহারের আবেদন, মন্ত্রীর নির্দেশনা এবং নীতিমালার সঙ্গে সম্ভাব্য সাংঘর্ষিক অবস্থান নিয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গত সোমবার সরেজমিনে রাজধানীর গুলশান-১-এর নিকেতন আবাসিক এলাকার এ ব্লকের ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত জি কে শামীমের কার্যালয়েও যান এই প্রতিবেদক। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটির দেয়ালে অস্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে ‘জি. কে. বি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’।

নিকেতন কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে অল্প দূরে অবস্থিত বাড়িটির মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে কোম্পানির নাম ও লোগোসংবলিত একটি গোলাকার মনোগ্রামও চোখে পড়ে। ভবনটির ভেতর থেকেই জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মী।

তারা প্রতিবেদককে বলেন, বাড়িটি জি কে শামীমের মালিকানাধীন এবং তিনি নিয়মিত এ কার্যালয়ে আসেন। তবে দিনের বেলায় সাধারণত তাকে দেখা যায় না। অধিকাংশ সময় সন্ধ্যার পর তিনি অফিসে প্রবেশ করেন। কোম্পানির অফিস ঘুরে দেখার কথা জানালে ফটকে দায়িত্বে থাকা কর্মী প্রতিবেদককে সন্ধ্যার পর আবার আসতে বলেন।

‘মানুষ একচ্ছত্র ব্যবসার সুযোগ চায় না’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের (Bangladesh Jatiyatabadi Jubo Dal) সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন আমার দেশকে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার সহযোগী কিংবা তাদের কোনো স্টেকহোল্ডার একচ্ছত্রভাবে ব্যবসা করার সুযোগ পাক—দেশের মানুষ এটি চায় না। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমিও তা চাই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত।’ তার মতে, সরকারি সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অতীতের বিতর্কিত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যতিক্রমী সুযোগ তৈরির চেষ্টা হলে তা জনগণের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দেবে।

জি কে শামীমের আবেদন এবং সেটির ওপর দেওয়া নির্দেশনার বিষয়ে রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আমার দেশকে আরও বলেন, ‘আমরা নীতিমালার বাইরে যাব না। বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগও নেই।’

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আবেদনটি, রেলওয়ের বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ডিং নীতিমালা, উন্মুক্ত দরপত্রের বাধ্যবাধকতা এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান আরও ভালোভাবে খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী।