ইমিগ্রেশন ছাড়াই দেশত্যাগ: হাসিনা-রেহানার বিরুদ্ধে নতুন মামলার প্রস্তুতি

দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) বিরুদ্ধে নতুন একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। একই মামলায় আসামি করা হবে তার সঙ্গে দেশত্যাগ করা ছোট বোন শেখ রেহানাকে (Sheikh Rehana)। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন না করে বাংলাদেশ ছাড়ার অভিযোগ আনা হচ্ছে।

২০১৩ সালের অভিবাসী আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলাটি দায়েরের সব ধরনের প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। শেখ হাসিনার পলায়নের সময়কার পুরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও তদন্ত শেষ করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার তথ্য পাওয়া গেছে, তাদেরও এ মামলায় যুক্ত করা হতে পারে। সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র আমার দেশকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা ৩টা ৯ মিনিটে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশ ছাড়ার জন্য ঢাকার বীরউত্তম একে খন্দকার বিমানঘাঁটি—তৎকালীন বঙ্গবন্ধু বিমানঘাঁটি—থেকে একটি বিমানে ওঠেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানে ওঠার সময় শেখ হাসিনার কাছে কূটনৈতিক পাসপোর্ট এবং শেখ রেহানার কাছে ব্রিটিশ পাসপোর্ট ছিল। তবে তারা কেউই ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করেননি। এ অবস্থাতেই তারা অবৈধভাবে দেশত্যাগ করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার প্রচলিত আইন অমান্যের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত পরিচালনাকারী সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, কেবল বিমানবন্দর কিংবা সরকার অনুমোদিত চেকপোস্ট দিয়ে নির্ধারিত ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শেষ করার পরই কোনো ব্যক্তি বৈধভাবে বিদেশে যেতে পারেন। ইমিগ্রেশন সম্পন্ন না করে কিংবা নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোনো পথ দিয়ে দেশত্যাগ করা হলে আইন অনুযায়ী সেটিকে অবৈধ ও বেআইনি হিসেবে গণ্য করা হবে।

সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে আদালত অনধিক পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানাও করতে পারেন।

অবশ্য জুলাই গণহ’\ত্যার প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal) এরই মধ্যে শেখ হাসিনাকে মৃ’\ত্যু’\দণ্ড দিয়েছেন। দুর্নীতির পৃথক মামলাতেও আদালত শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন। বর্তমানে দুই বোনই দণ্ডিত পলাতক আসামি।

শেখ হাসিনা পালিয়ে গিয়ে ভারতে (India) আশ্রয়ে থাকলেও শেখ রেহানার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তদন্তকারী দলের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের নাগরিক শেখ রেহানা বর্তমানে লন্ডনে বসবাস করছেন। মাঝেমধ্যে তিনি ভারতেও যাতায়াত করেন।

নিজের সিদ্ধান্তেই বোনকে নিয়ে পালান হাসিনা

শেখ হাসিনার ভারত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বাইরে নানা ধরনের আলোচনা থাকলেও তদন্তে উঠে এসেছে, দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নিয়েছিলেন। অনুসন্ধান প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা গণভবনের—বর্তমানে জুলাই জাদুঘর—লেক রোডের গেট দিয়ে বের হন। সেখান থেকে সড়কপথে গাড়িতে করে তারা পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে পৌঁছান।

পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠ থেকে তাদের হেলিকপ্টারে করে কুর্মিটোলার তৎকালীন বঙ্গবন্ধু বিমানঘাঁটিতে নেওয়া হয়। সেখানে নিজের লাগেজপত্রসহ বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি লকহিড সি-১৩০জে হারকিউলিস বিমানে ওঠেন শেখ হাসিনা। বিমানটির কল সাইন ছিল এজেএএক্স১৪৩১।

তদন্তে পাওয়া তথ্য বলছে, পুরো প্রক্রিয়াটি শেখ হাসিনার ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছিল। দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও তিনি গণভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন। পরে তার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে ভারতে নেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

পলায়নের উদ্দেশ্যে গণভবন থেকে বের হওয়ার পর শেখ হাসিনার হাতে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ছিল। এরপরও তিনি ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করেননি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এটি ইমিগ্রেশনবিষয়ক প্রচলিত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

গণভবন থেকে ভারতের হিন্দন বিমানঘাঁটি পর্যন্ত শেখ হাসিনার সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে নতুন মামলায় সাক্ষী করা হতে পারে। তদন্তদলের এক সদস্য এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।

অডিও ক্লিপে পলায়নের প্রস্তুতির কথোপকথন

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে দুটি অডিও ক্লিপও আলামত হিসেবে গ্রহণ করেছে তদন্তদল। প্রথম অডিওটি ৫ আগস্ট পলায়নের উদ্দেশ্যে গণভবন থেকে বের হওয়ার পরপরই ধারণ করা বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

ওই অডিওতে শেখ রেহানাকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা একটি নিরাপদ জায়গায় যাচ্ছি। আপনি এক সেকেন্ডও দেরি না করে বেরিয়ে যান।’

শেখ রেহানার এ কথার জবাবে সালমান এফ রহমান জানতে চান, ‘আচ্ছা, তোমরা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছ? আপাও শেখ হাসিনা তোমার সঙ্গে গেছে?’

জবাবে শেখ রেহানা বলেন, ‘জি ভাই। আপনিও ইমিডিয়েটলি বের হয়ে যান। এখানে থাকা একদম সেফ না। এক মিনিটও দেরি কইরেন না।’

শেখ রেহানা এবং পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মধ্যকার দুই মিনিট ৯ সেকেন্ডের ওই কথোপকথনের অডিওর ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে তদন্ত সংস্থা। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফরেনসিক প্রতিবেদনে অডিওটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

তদন্তে নেওয়া দ্বিতীয় অডিওতে শেখ হাসিনাকে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে তিনি আর দেশে থাকতে পারবেন না—পলায়নের আগের দিনই এমন আশঙ্কার কথা হাছান মাহমুদকে জানিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

৪ আগস্টের ওই টেলিফোন কথোপকথনে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, ‘তারা আন্দোলনকারীরা কারফিউ-টারফিউ কিছু মানছে না। আমি ঠিক করেছিলাম আজই রাষ্ট্রপতির কাছে যাব। সবকিছু লিখে ঠিক করে রেখেছি। এভাবে ক্ষমতায় থাকা আর সম্ভব না।’

তার এ কথার জবাবে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘ইমার্জেন্সি জারি করে দেখেন না।’

তখন শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন আর ইমার্জেন্সিতেও কাজ হবে না। তুমি আবার এটি বাইরে বলতে যেও না। এ দেশে আর থাকা সম্ভব না। এ দেশে আর না।’

শেখ হাসিনা ও হাছান মাহমুদের ওই কথোপকথনের অডিওরও ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে তদন্তদল। পরীক্ষার পর তৈরি করা প্রতিবেদনে অডিও ক্লিপটির কণ্ঠ শেখ হাসিনা ও হাছান মাহমুদের বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

ভারতেরও দায় দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন না করেই দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। ইমিগ্রেশন আইনজীবীদের মতে, এভাবে দেশত্যাগ ও অন্য দেশে প্রবেশের মধ্য দিয়ে তারা বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশের আইনই লঙ্ঘন করেছেন।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আমার দেশকে বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ভোটাধিকার হরণের পাশাপাশি শেখ হাসিনা একজন গণহ’\ত্যাকারী। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনেও এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, জুলাই আন্দোলনের মুখে দেশে টিকতে না পেরে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি প্রচলিত আইন অনুযায়ী ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করেননি বলে জানা গেছে। এটি আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সরকারের রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সালেহ উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, জুলাই বিপ্লবের মুখে শেখ হাসিনা জনরোষ থেকে বাঁচতে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম ছাড়াই ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। ছোট বোন শেখ রেহানাকেও একইভাবে নিজের সঙ্গে নিয়ে গেছেন। ফলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে।

সালেহ উদ্দিন বলেন, শেখ হাসিনা কেবল বাংলাদেশের আইনই ভঙ্গ করেননি, একই সঙ্গে ভারতের ইমিগ্রেশন আইনও লঙ্ঘন করেছেন। বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স ছাড়া ভারত কোনোভাবেই শেখ হাসিনাকে গ্রহণ করতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিতে হলে আন্তর্জাতিক আইন মেনে তাকে শরণার্থী বা রিফিউজি হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। ভারত তাকে ঠিক কোন আইনি মর্যাদা বা স্ট্যাটাসে গ্রহণ করেছে, সেটি দেশটির কর্তৃপক্ষকেই পরিষ্কার করতে হবে।

অবশ্য ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জয়সওয়াল সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা ভারতে আইনগত প্রসেসের মধ্যে রয়েছেন। তিনি নিজের ইচ্ছায় ভারত ত্যাগ করতে পারবেন না।’

শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পালিয়ে যাওয়ার পরপরই তাদের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশনবিষয়ক প্রচলিত আইনে মামলা হওয়া প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী জয়নাল আবেদীন মেজবাহ।

আমার দেশকে তিনি বলেন, অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষ হওয়ার পর দেরিতে হলেও সরকার এখন মামলা দায়েরের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি আশার কথা।

শেখ হাসিনার অপরাধের বর্ণনা দিতে গিয়ে অ্যাডভোকেট মেজবাহ বলেন, শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের ঘটনা বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার ও প্রকাশ করেছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা গণহ’\ত্যার অভিযোগের বিস্তারিত বর্ণনাও জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে।

তিনি বলেন, এমন একজন গণহ’\ত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী জনরোষ থেকে বাঁচতে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। নিজে পালানোর আগেই তিনি নিজের আত্মীয়স্বজনদের নিরাপদে দেশ থেকে বের করে দিয়েছিলেন।

মেজবাহ আরও বলেন, শেখ হাসিনার দল ও আত্মীয়দের মধ্যে আরও যারা ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন না করে বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তাদের বিষয়েও অনুসন্ধান ও তদন্ত করা জরুরি। তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

হাসিনার পলায়ন ও পদত্যাগের ঘোষণা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর সেদিন বিকেলেই দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য দেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান (General Waker-Uz-Zaman)।

বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। এখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মাধ্যমে দেশের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

একই দিন রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আপনারা জানেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং আমি তা গ্রহণ করেছি।’

পরদিন ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করার কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংসদ বিলুপ্ত করার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সর্বসম্মত মতামত নেওয়া হয়েছে।

এর দুই দিন পর, ৮ আগস্ট, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের (Dr Muhammad Yunus) নেতৃত্বে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে।

তবে সেনাপ্রধানের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগের ঘোষণা প্রচার হওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

গোপন রাখা হয়েছিল বিমানের যাত্রাপথ

শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার প্রায় এক মাস পর জানা যায়, তার অবস্থান ও যাত্রাপথ গোপন রাখার জন্য তাকে বহনকারী এজেএক্স১৪৩১ ফ্লাইটের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা হয়েছিল।

শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি ঢাকা থেকে উড্ডয়নের পর প্রথমে কলকাতার দিকে যায়। কারণ বিমানটি যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশের আকাশসীমা অতিক্রম করতে চেয়েছিল।

ঢাকা থেকে দিল্লি যাওয়ার প্রচলিত আকাশপথ অনুসরণ করলে বিমানটিকে রাজশাহীর ওপর দিয়ে যেতে হতো। সে ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি বাংলাদেশের আকাশসীমায় আরও কয়েক মিনিট অবস্থান করত। এ কারণেই প্রথমে কলকাতার দিকের পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।

ভারতের সীমান্ত এলাকায় পৌঁছানোর পর বিমানটি দিল্লি থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমানঘাঁটির দিকে যায়। ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে বিমানটি হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে।

বিমান থেকে নামার পর শেখ হাসিনাকে উত্তর প্রদেশের নয়ডায় একটি নিরাপদ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

হাসিনাকে হিন্দন বিমানঘাঁটিতে নামিয়ে দেওয়ার পর বিমানটিতে জ্বালানি নেওয়া হয়। এরপর ফ্লাইটের ক্রু এবং সিকিউরিটি সার্ভিসেস ফোর্স বা এসএসএফ সদস্যদের নিয়ে বিমানটি একই দিন ঢাকায় ফিরে আসে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার পাশাপাশি ওই বিমানের ক্রু এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের কেউই ঢাকা ছাড়ার আগে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করেননি।

তদন্তকারী দলের এক সদস্য জানিয়েছেন, ছাত্র-জনতা যখন গণভবনে প্রবেশ করে, তখন শেখ হাসিনা তাকে বহনকারী বিমানে অবস্থান করছিলেন। ঠিক ওই সময়েই বিমানটির ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ট্রান্সপন্ডারের মাধ্যমে একটি বিমানের অবস্থান, গন্তব্য, উচ্চতা, গতি এবং স্বয়ংক্রিয় জিওলোকেটরের তথ্য পাওয়া যায়। শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি পশ্চিমবঙ্গের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর এর ট্রান্সপন্ডার আবার চালু করা হয়।

অন্যদিকে বিমানটির জিওলোকেটর চালু করা হয় ঢাকা-কলকাতা রুটের ‘বিইএমএকে’ ওয়ে পয়েন্টে পৌঁছানোর পর। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিমানটিকে ১৪৩১ কোড নম্বর দেয়।

এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল থেকে প্রতিটি বিমানকে চার সংখ্যার পৃথক কোড দেওয়া হয়। শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানের ট্রান্সপন্ডারে ১৪৩১ কোডটি ম্যানুয়ালি যুক্ত করা হয়েছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানের যাত্রাপথ এবং বাংলাদেশের আকাশসীমার ভেতরে এর অবস্থান গোপন রাখার উদ্দেশ্যেই ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা হয়েছিল।

শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে বহনকারী বিমানটিকে ২৪ হাজার ফুট উচ্চতায় ওঠার অনুমতি দেওয়া হয়। বিমানটি উড্ডয়নের পর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ট্রাফিক কন্ট্রোলার এর পাইলটকে একটি সতর্কবার্তাও পাঠিয়েছিলেন।

সতর্কবার্তায় জানানো হয়, আরেকটি বিমান ঢাকার দিকে আসছে এবং সেটি শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানের ঠিক ওপরে অবস্থান করছে।

ভারতের পার্লামেন্টে জয়শঙ্করের বক্তব্য

শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পরদিন, ৬ আগস্ট, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর দেশটির পার্লামেন্টে একটি বিবৃতি দেন। বক্তব্যে তিনি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেন।

জয়শঙ্কর বলেন, ‘আমাদের জানামতে নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন ভারতে আছেন।’

পরে ভারতের একটি সংসদীয় কমিটির সভায় জয়শঙ্কর বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা জানতাম হাসিনার সরকার টিকবে না। তবে কিছু করার ছিল না। পরিস্থিতি আমাদের হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল।’

জুলাই গণহ’\ত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনার মৃ’\ত্যু’\দণ্ডাদেশের কথা উল্লেখ করে তাকে ফেরত চেয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে দিল্লির কাছে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বাংলাদেশের পাঠানো এসব চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

এদিকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃ’\ত্যু’\দণ্ডের রায় কার্যকর করার বিষয়ে বর্তমান সরকার আশাবাদী। জাতীয় সংসদে দেওয়া পৃথক বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করার অঙ্গীকার করেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, স্বৈরাচার হাসিনা একটি দেশে আশ্রয় নিয়েছেন এবং সেখান থেকে বড় বড় কথা বলছেন। আইন অনুযায়ী সরকার তার প্রত্যাবর্তন চেয়েছে।

তিনি বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে তাগাদাপত্র দিয়েছে। সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কার্যকর করতে চায়।