ফাইনালের এক ম্যাচে মেসির উত্তরাধিকার বিচার অন্যায়, সমালোচকদের জবাব গাঙ্গুলির

২০২৬ বিশ্বকাপে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়ে ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা (Argentina)। কিন্তু মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে স্পেনের কাছে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের অভিযান। নিজের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা লিওনেল মেসি (Lionel Messi)-ও ফাইনালে ছিলেন অনেকটাই নিষ্প্রভ। আর সেই ম্যাচের পর থেকেই আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে ঘিরে শুরু হয়েছে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা।

তবে একটি ম্যাচে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দেখাতে না পারার কারণে মেসির মতো একজন কিংবদন্তির পুরো ক্যারিয়ারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতাকে একেবারেই গ্রহণযোগ্য মনে করছেন না সৌরভ গাঙ্গুলি (Sourav Ganguly)। ভারতের সাবেক অধিনায়ক ও বিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মনে করেন, একটি মাত্র ম্যাচ কখনোই মেসির দীর্ঘ ও অসাধারণ ফুটবল-যাত্রার মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না।

গাঙ্গুলির মতে, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের জীবনেও খারাপ দিন আসে। প্রতিটি ম্যাচে একই মানের পারফরম্যান্স দেখানো কোনো খেলোয়াড়ের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই বিশ্বকাপ ফাইনালে মেসির নিষ্প্রভ উপস্থিতিকে সামনে এনে তার পুরো ক্যারিয়ার ও উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা অন্যায়।

সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গাঙ্গুলি বলেন, ‘লিওনেল মেসির উত্তরাধিকার কখনোই একটি ম্যাচের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, সেও একজন মানুষ। প্রতিদিন একই মানের পারফরম্যান্স করা সম্ভব নয়। খারাপ দিন আসবেই। একটি ফাইনাল বা একটি পারফরম্যান্স দিয়ে তার পুরো ক্যারিয়ারের মূল্যায়ন করা একেবারেই অন্যায়।’

পুরো টুর্নামেন্টে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে থাকা মেসিকে ফাইনালে অবশ্য চেনা ছন্দে দেখা যায়নি। স্পেন (Spain)-এর শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণভাগ আর্জেন্টিনার আক্রমণকে কার্যকরভাবে আটকে রাখে। প্রতিপক্ষের পরিকল্পিত রক্ষণ ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিজের স্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি ৩৯ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ড।

ফাইনালের আগে টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মেসিকে ঘিরে প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি। কিন্তু শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে তিনি নিজের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে না পাওয়ায় ম্যাচের পর তার প্রভাব ও বয়স নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন অনেক সমালোচক।

গাঙ্গুলি অবশ্য সেই আলোচনাকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তার চোখে, ফাইনালে মেসির ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের চেয়েও বড় বিষয় ছিল দুই দলের কৌশলগত ব্যবধান। তরুণ ও উদ্যমী স্পেনের বিপক্ষে পরিকল্পনা ও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা পিছিয়ে পড়েছিল বলেই মনে হয়েছে তার।

ফাইনালে আলবিসেলেস্তেদের সামগ্রিক পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গাঙ্গুলি বলেন, ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনাকে তাদের পরিচিত ফুটবল খেলতে দেয়নি স্পেন। বলের গতি, জায়গার ব্যবহার এবং আক্রমণ প্রতিহত করার পরিকল্পনায় স্প্যানিশ দল ছিল অনেক বেশি প্রস্তুত।

গাঙ্গুলি বলেন, ‘আমি পুরো বিশ্বকাপ দেখিনি। তবে সেমিফাইনাল ও ফাইনালসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ম্যাচ দেখেছি। ফাইনালে আমার মনে হয়েছে, শুরু থেকেই স্পেন আর্জেন্টিনাকে তাদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে দেয়নি। কৌশলগতভাবে স্পেন অনেক বেশি প্রস্তুত ছিল।’

তার পর্যবেক্ষণে, ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেননি। স্পেনের সংগঠিত ফুটবল ও কৌশলগত প্রস্তুতির কারণে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ প্রত্যাশিত সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। এর প্রভাব পড়ে মেসির খেলাতেও।

তবে ফাইনালের পরাজয়ের মধ্যেও আর্জেন্টিনার পুরো বিশ্বকাপ অভিযানকে ব্যর্থ বলতে নারাজ গাঙ্গুলি। তার মতে, টানা বড় প্রতিযোগিতাগুলোতে সাফল্যের পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছানোই দলটির ধারাবাহিকতার বড় প্রমাণ।

কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা জয়, কোপা আমেরিকায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং ২০২৬ বিশ্বকাপেও ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া—এই ধারাবাহিক অর্জনকে আর্জেন্টিনার বড় সাফল্য হিসেবেই দেখছেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক। তার মতে, বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় টানা দুই আসরে ফাইনালে পৌঁছানো কোনো সাধারণ অর্জন নয়।

মেসির নেতৃত্বে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্জেন্টিনা যে ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছে, একটি ফাইনালের পরাজয় সেই অর্জনকে মুছে দিতে পারে না। একইভাবে, শিরোপা নির্ধারণী একটি ম্যাচে স্বাভাবিক ছন্দে না থাকলেও তাতে মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারের মর্যাদা কমে যায় না বলেই মনে করেন গাঙ্গুলি।

ফাইনালের পর মেসির আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনাও নতুন করে বেড়েছে। ৩৯ বছর বয়সে নিজের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ খেলা আর্জেন্টাইন মহাতারকা জাতীয় দলের হয়ে ভবিষ্যতে খেলবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি।

তবে মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা যতই বাড়ুক, একটি পরাজয় কিংবা একটি ম্যাচ তার অসাধারণ ক্যারিয়ারের মূল্য কমিয়ে দিতে পারে না বলে বিশ্বাস করেন গাঙ্গুলি। ব্যক্তিগত অর্জন, দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতা এবং আর্জেন্টিনার হয়ে তার অবদান—সবকিছু মিলিয়েই মেসির উত্তরাধিকার বিচার করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

গাঙ্গুলির ভাষায়, ‘ফাইনালে ওঠাটাই আর্জেন্টিনার জন্য বড় সাফল্য। তবে ফুটবলে একটি দল জিতবে, আরেকটি দল হারবে—এটাই এই খেলার স্বাভাবিক নিয়ম।’

তার এই বক্তব্যে যেমন মেসির প্রতি সমর্থন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ফুটবলের অনিশ্চয়তাকে মেনে নেওয়ার আহ্বান। একটি ম্যাচে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হলেও একজন খেলোয়াড়ের পুরো ক্যারিয়ার, তার অর্জন কিংবা ফুটবলে রেখে যাওয়া প্রভাবকে শুধু সেই ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না—সমালোচকদের মূলত সেই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন সৌরভ গাঙ্গুলি।