তীব্র লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত সারাদেশ, কোথাও ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ নেই

ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে সারাদেশ। গত কয়েক দিনের তুলনায় রোববার তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তেই বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হয়েছে। দিন-রাত নির্দিষ্ট কোনো শিডিউল ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

গ্রাহকদের অভিযোগ, কোথাও ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১২ ঘণ্টা, আবার কোথাও দিন-রাত মিলিয়ে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে শুধু গৃহস্থালি কাজ নয়, ব্যাহত হচ্ছে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ও স্বাস্থ্যসেবা। বিদ্যুৎ সংকটে পোলট্রি খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে। আবার বরফের সংকটে সাগরে যেতে পারছেন না জেলেরা। রংপুর, সিলেট, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও বরিশালে পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি খারাপ বলে জানা গেছে।

গত শনিবার মধ্যরাত থেকে রোববার রাত ১০টায় প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত অধিকাংশ সময় বিতরণ কোম্পানিগুলো তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করেছে। অল্প কিছু সময় তা কমলেও লোডশেডিং ছিল আড়াই হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। সরকারি কোম্পানিগুলোর ওয়েবসাইটে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, প্রকৃত লোডশেডিং চার হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।

চলমান গ্যাস সংকটের পাশাপাশি দেশের কয়লাভিত্তিক পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ভারত থেকে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের ঘাটতি আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। ওই সময় লোডশেডিং করা হয় দুই হাজার ৪৩৭ মেগাওয়াট। এর আগে বিকেল ৩টায় ১৬ হাজার ৫১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে রেকর্ড তিন হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়। এর আগে গত ৩ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৭ জুন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল তিন হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট।

সাধারণত সকালবেলায় বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় লোডশেডিংও কম হয়। কিন্তু রোববার সকালেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না। দুপুর ১২টায় ১৫ হাজার ৭৩৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তিন হাজার ৩১২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। আর শনিবার রাত ১২টায় একই ১৫ হাজার ৭৩৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ৬০৮ মেগাওয়াট।

গ্যাস সংকটেই বড় ধাক্কা বিদ্যুৎ উৎপাদনে

বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়াকেই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে আগে যেখানে প্রতিদিন ৯৯ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, বর্তমানে দেওয়া হচ্ছে প্রায় ৬৮ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

গ্যাস থেকে আগে যেখানে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো, এখন সেখানে গড়ে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এর সঙ্গে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় সেখান থেকে মাত্র ৫০০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ভারত থেকে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহও কমেছে।

সারাদেশে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার সাত ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চলে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে।

যশোরের অভয়নগরে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছে পোলট্রি খাত। শনিবার সকালে নওয়াপাড়া পৌরসভার বুইকরা গ্রামের একটি খামারে প্রায় আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চার শতাধিক মুরগি মারা গেছে। খামারিদের দাবি, তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় মুরগিগুলোর মৃত্যু হয়েছে।

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় লোডশেডিংয়ের কারণে বিপাকে পড়েছেন জেলেরা। আলীপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দরে বিদ্যুৎ সংকটে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। বাড়তি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় বরফ পাওয়া যাচ্ছে না। ১৫০ টাকার এক ক্যান বরফ এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়। বরফের অপেক্ষায় ঘাটে নোঙর করে আছে শত শত মাছধরা ট্রলার। ফলে ইলিশ মৌসুমে জেলেদের সাগরে যাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম ও সুনামগঞ্জেও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ গ্রাহকরা। সুনামগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে দিন-রাত মিলিয়ে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। কুড়িগ্রামে নির্দিষ্ট শিডিউল ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও গৃহস্থালি কর্মকাণ্ড।

রংপুরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনে-রাতে সমানতালে বিদ্যুৎবিভ্রাটে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। গরমে শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তি বাড়ছে। বিদ্যুৎনির্ভর ছোট কারখানাগুলোর উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

সিলেটে চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম থাকায় তৈরি হয়েছে ঘাটতি। শনিবার ২২৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৮১ মেগাওয়াট। ফলে ৪৩ মেগাওয়াট ঘাটতি সামাল দিতে নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিং করতে হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের বন্দরেও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নাজুক বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। তাঁর দাবি, সেখানে ঘণ্টায় তিন থেকে চারবার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে লোডশেডিং করতেই হলে তা যেন পরিকল্পিতভাবে করা হয়, সেই আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এখনও কাটেনি গ্যাসের ঘাটতি

মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালটিও এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি। বর্তমানে টার্মিনালটি থেকে প্রায় ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। দ্বিতীয় বয়লার চালু হলে আরও প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দুর্ঘটনার আগে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর সরবরাহ কমে প্রায় ২১২ কোটি ঘনফুটে নেমে যায়। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২৩৫ কোটি ঘনফুট হয়েছে। তবে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার তুলনায় এই সরবরাহ এখনও অনেক কম।

ফলে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ থাকা এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে দেশের বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর সরাসরি চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জরুরি সেবায়।