দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬ বাতিল করেছে সরকার। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশজুড়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ২০২৬ সালের তালিকায় কোনো ঘাটতি থাকলে তা সংশোধন, সংযোজন বা বিয়োজনের সুযোগ ছিল। প্রয়োজনে তালিকাটি বাতিল করে ২০১৬ সালের নীতিতে ফিরে যাওয়ার পথও খোলা ছিল। কিন্তু সে পথে না গিয়ে সরকার প্রায় ৩২ বছর আগের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ায় ওষুধের বাজারে এর প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ১৯৯৪ সালের পুরোনো তালিকা বর্তমান সময়ের রোগব্যাধি ও ওষুধের বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এরই মধ্যে ওই সময়ের অনেক ওষুধ বাজার থেকে বিলুপ্ত হয়েছে, আবার নতুন অনেক ওষুধও বাজারে এসেছে। ফলে পুরোনো তালিকা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জন্য কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্তকে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের একচেটিয়া সুবিধা পাওয়ার কৌশল হিসেবেও দেখছেন দেশের কয়েকজন জনস্বাস্থ্যবিদ।
তবে ওষুধ প্রশাসন বলছে, বিষয়টি স্থায়ীভাবে ১৯৯৪ সালের তালিকায় আটকে থাকবে না। দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা শিগগিরই নতুন করে প্রণয়ন করা হবে। ইতিমধ্যে গত ২৯ জুন ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর বিধান অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এই পরিষদে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। ওষুধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে এবং একই সঙ্গে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় থাকে।
কেন বাতিল হলো ২০২৬ সালের তালিকা
গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬ এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পেছনে কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের আইন অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শের ভিত্তিতে ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ করার কথা।
কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাটি জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ ছাড়াই প্রণয়ন করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ তালিকার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একাধিক রিটও করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন। এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৬ সালের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা আগের মতো বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে এখানেই তৈরি হয়েছে মূল বিতর্ক। বাংলাদেশে প্রথম অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছিল ১৯৮২ সালে। এরপর ১৯৯৪ সালের তালিকায় ১১৭টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৮ সালে ২০৯টি ওষুধ নিয়ে নতুন তালিকা করা হলেও সেটি পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। পরে ২০১৬ সালের নীতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৮৫টি করা হয়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের নীতিতে সেই সংখ্যা আরও বাড়িয়ে ২৯৬টিতে উন্নীত করা হয়েছিল।
এখন আবার ১৯৯৪ সালের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ায় অত্যাবশ্যকীয় তালিকা থেকে বর্তমান সময়ে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ওষুধ বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৯৪ সালের তালিকায় থাকা অনেক ওষুধ ইতোমধ্যে বাজার থেকে বাতিল বা বিলুপ্ত হয়েছে। ফলে বর্তমান রোগের ধরন, চিকিৎসাব্যবস্থা এবং ওষুধের বাজার বিবেচনায় না নিয়ে তিন দশকের বেশি পুরোনো নীতিতে ফিরে যাওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে বড় আশঙ্কা
বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা পুরোপুরি বাতিল করে এক ধাক্কায় ১৯৯৪ সালের তালিকায় ফিরে যাওয়া কোনো সাধারণ আইনি ত্রুটি নয়। তার দাবি, এটি ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের একচেটিয়া সুবিধা নেওয়ার একটি কৌশল।
তার মতে, নতুন তালিকায় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল। এতে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হতে পারত। তার অভিযোগ, ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে নীতিনির্ধারকদের এমনভাবে প্রভাবিত করেছেন, যার ফলে সংস্কারের পরিবর্তে ৩২ বছর পুরোনো নিয়মে ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ২০২৬ সালের তালিকায় কোনো ঘাটতি থাকলে তা সংশোধন বা সংযোজন-বিয়োজন করা যেত। প্রয়োজনে তালিকাটি বাতিল করে জনগণের মতামত নিতে গণশুনানি করা যেত এবং পরে নতুন করে জনবান্ধব তালিকা তৈরি করা সম্ভব ছিল। কিন্তু তা না করে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ায় তিনি মনে করেন, জনগণের স্বাস্থ্য ও পকেটের সুরক্ষার চেয়ে ব্যবসায়ীদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, দেশের ওষুধ খাতের নীতিমালা এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
তার ভাষ্য, ১৯৯৪ সালে অনেক ওষুধ ছিল, যেগুলো এখন আর নেই। এর মধ্যে অনেক ওষুধ বাতিল হয়েছে, আবার নতুন বহু ওষুধ বাজারে এসেছে। পাশাপাশি মানুষের এমন অনেক রোগ এখন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে, যেগুলো ৩২ বছর আগে সেই অর্থে অত্যাবশ্যকীয় ছিল না। ফলে এত পুরোনো নিয়মে ফিরে যাওয়া ভালো সিদ্ধান্ত নয়।
ডা. মুশতাক হোসেনের আশঙ্কা, যেখানে ওষুধের দাম কমার কথা, সেখানে এই সিদ্ধান্তের কারণে দাম আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাজার যদি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে। সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও পরিকল্পনা ছাড়া বাজারকে খোলাবাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হঠকারিতা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নতুন তালিকা তৈরির আশ্বাস ওষুধ প্রশাসনের
অন্যদিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন বলছেন, ১৯৯৪ সালের বাস্তবতা আর বর্তমান ওষুধের বাজার এক নয়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সে সময় ৬০০ থেকে ৭০০ ধরনের ওষুধের মধ্যে সরকার ১১৭টিকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে তালিকাভুক্ত করে মূল্য নির্ধারণ করেছিল। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ধরনের ওষুধ রয়েছে। ফলে নতুন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করা হলে সেটি আগের তুলনায় দীর্ঘ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তিনি জানান, চলতি বছরই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর বিধান অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদও গঠন করা হয়েছে।
ওষুধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন তালিকা প্রণয়ন করা হবে। ওষুধের মূল্যও এমনভাবে নির্ধারণের চেষ্টা থাকবে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি না হয়। একই সঙ্গে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তবে নতুন তালিকা কবে চূড়ান্ত হবে এবং সেটিতে বর্তমান সময়ের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়গুলো কীভাবে প্রতিফলিত হবে—এখন সেই দিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের। কারণ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা শুধু প্রশাসনিক একটি নথি নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে চিকিৎসার সুযোগ, ওষুধের দাম এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসুরক্ষা।
