সিলেটের ট্রিপল মা’\রডারে নতুন মোড়, পরিবারের অভিযোগের কেন্দ্রে সিরাজুল ইসলাম

সিলেটে তিনজনের মা’\রডারের ঘটনায় তদন্তে নাটকীয় মোড় দেখা দিয়েছে। পুলিশের কাছে দায় স্বীকার করা বাবুল মিয়ার পরিবর্তে এখন নিহতদের পরিবারের অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে সিরাজুল ইসলামের নাম। শুক্রবার রাতে কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় বাবুলকে আসামি করা হয়নি। এজাহারে অজ্ঞাতনামা আসামিদের কথা বলা হলেও অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণে সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে নিহত পরিবারের দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ফলে পরিবারের দাবির ভিত্তিতে আলোচিত এই মামলার তদন্ত নতুন দিকে মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মামলার বাদী নিহত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা বলেছেন, প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এই ট্রিপল মা’\রডার হয়েছে—এমন ব্যাখ্যা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। তার দাবি, ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে এবং সেই বিষয়গুলোই এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

বুধবার সিলেটের রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকায় নিজ বাসায় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং তাদের কাজের মেয়ে তাহমিনা বেগমকে জবাই ও কুপিয়ে মা’\রডার করা হয়। ঘটনার পর বিকেলে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ একই এলাকার বাসিন্দা রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল ঘটনার দায় স্বীকার করেন বলে জানায় পুলিশ। তাদের দাবি, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরেই তিনজনকে খু’\ন করা হয়েছে।

এদিকে ঘটনার খবর পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরেন নিহত আব্দুস সাত্তারের মেয়েরা। শুক্রবার বিকেলে লাশ দাফনের পর রাতে তিন মা’\রডারের ঘটনায় থানায় এজাহার দেন নিহতের প্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা। তবে কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা ওই এজাহারে পুলিশে গ্রেপ্তার হওয়া বাবুল মিয়াকে আসামি করা হয়নি।

এজাহারে সেলিনা উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ও তার বাবা পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় আনুমানিক ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করে আসছিলেন। ২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম তাদের লিজ নেওয়া জমিসহ সমিতির ৮০ শতক জমি ইম্পালস বিল্ডার্সের নামে সাব-কবলা দলিল করেন এবং নামজারি করে মালিকানা দাবি করেন।

এই জমি নিয়ে ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বত্ব মামলা করেন আব্দুস সাত্তার। পরে মামলাটি রূপান্তরিত হয়ে যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। সেলিনার দাবি, মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে ও তার বাবাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে।

এজাহারে সেলিনা আরও অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি সিরাজুল ইসলাম, আমিন হোসেনসহ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তার বাবার বাসায় গিয়ে স্বত্ব মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে ঘটনাটি নিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে মামলাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সিরাজুল ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করেন বলে অভিযোগ করেন সেলিনা। এ ঘটনায় তৌহিদুল ইসলাম থানায় অভিযোগ করেন। পরে প্রতিকার না পেয়ে গত বছরের ৬ আগস্ট আদালতে মামলা করেন তিনি। মামলাটি ডিবি সিলেট তদন্ত করছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহার দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সেলিনা সুলতানা। তিনি বলেন, একজন মানুষ একাই তিনজনকে খু’\ন করবে—এটি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তার ভাষায়, ‘এটা হতে পারে না।’ বাসার গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সেলিনা বলেন, ‘কাজের মেয়েটাকে বাঁচাতে গিয়ে আমার মা মা’\রা গেছেন। একটা বাচ্চা মেয়ে, সে খুব ভালো ছিল, মেয়েটার কাছে কোনো মোবাইল ছিল না। মেয়েটা আমাদের কাছে আমানত ছিল।’ তার অভিযোগ, ‘কেসটা ঘুরানোর জন্য মেয়েটাকে দেখানো হচ্ছে। এটা সত্য কোনো ঘটনা না।’

আব্দুস সাত্তারের আমেরিকাপ্রবাসী ছেলে আরিফ ইফতেখারও পরিবারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বটম লাইনে আছি। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে পুলিশ যা বলছে সেটি আমরা মানছি না। মামলায় আমাদের অভিযোগ উল্লেখ করেছি। আমরা ওয়েট করি, দেখি রিমান্ডে নেওয়া হোক, তদন্ত হোক।’

এদিকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) গতকাল বিকেলে জানান, নিহতের মেয়ে থানায় যে এজাহার দিয়েছেন, সেটি রেকর্ড করা হয়েছে। মামলায় আসামি অজ্ঞাত রাখা হয়েছে। পুলিশ সার্বিক বিষয় তদন্ত করে দেখবে বলেও জানান তিনি।

পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া বাবুল মিয়াকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। এরপর আইনগত প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।

অন্যদিকে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে জমিসংক্রান্ত বিরোধে থাকা অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানেন না এবং যেহেতু পুলিশ তদন্ত করছে, তাই তদন্তাধীন বিষয়ে কথা বলা উচিত নয়। জায়গা নিয়ে বিরোধ এবং মামলা রয়েছে—এটি মিথ্যা নয় উল্লেখ করে তিনি এর বেশি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে শনিবার দুপুরে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে যান বস্ত্র, পাট ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তারা পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি মামলার বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকলে সেটিও পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে বের করবে বলে তারা পরিবারকে আশ্বস্ত করেন।