ব্যক্তিগত আক্রমণের জবাব দেব, ‘এমন সুশীল ব্যক্তি আমি না’: রাশেদ খাঁন

‘আমাকে কেউ ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করবে, আর আমি তাকে চুমু দিবো! এমন সুশীল ব্যক্তি আমি না’—এমন মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন (Rashed Khan)। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।

পোস্টে রাশেদ খাঁন বলেন, আগের দিন এটিএন নিউজ (ATN News)-এর টকশোতে তিনি পুরো সময় গঠনমূলকভাবে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। তবে আলোচনার শেষ অংশে সারোয়ার তুষার (Sarwar Tushar) তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। রাশেদের ভাষ্য অনুযায়ী, তুষার দাবি করেন—মিডিয়া দেখলে তিনি সবার আগে থাকেন, আর পুলিশ দেখলে সবার পরে। তুষার নাকি এই তথ্য গণঅধিকার পরিষদ (Gono Odhikar Parishad)-এর নেতাদের কাছ থেকে শুনেছেন।

এর জবাবে রাশেদ প্রশ্ন তোলেন, সেই নেতারা কারা? তার দাবি, যাদের কথা বলা হচ্ছে, তাদের অনেকে গণঅভ্যুত্থানের পরপরই এনসিপিতে যুক্ত হয়েছেন। নিজের রাজনৈতিক অতীতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)-কে কটূক্তির অভিযোগে করা মামলায় তিনি কারাগারে গেছেন এবং ১৫ দিন রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু এর জবাবে সারোয়ার তুষার তাকে বলেছেন, ‘জেল তো চুরির মামলায়ও হয়।’ রাশেদের অভিযোগ, তার রাজনৈতিক জীবনে জেল-জুলুমের যে অভিজ্ঞতা, সেটিকে তুষার কোনো মূল্যই দেননি। অথচ ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুগপৎ আন্দোলনে রাজপথে থেকে তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলে দাবি করেন।

সেই সময় সারোয়ার তুষারকে কখনো রাজপথে দেখেননি উল্লেখ করে রাশেদ বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় তিনি ছাত্র ছিলেন না যে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন। তবে শেখ হাসিনা মানুষ হ’\ত্যা শুরু করলে তিনি ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয়ের কাজ করেছেন বলে দাবি করেন।

পোস্টে তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আখতার হোসেনদের সঙ্গে জাতিসংঘের বাংলাদেশ প্রতিনিধির বৈঠক তার মাধ্যমেই হয়েছিল। তার দাবি, ১৮ জুলাই তিনিই প্রথম দুই সমন্বয়ক—আসিফ মাহমুদ ও আহনাফ সাঈদ খানকে আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়ে মধ্যস্থতার কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আহনাফ সাঈদ খানকে লজিস্টিক সহায়তাও দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

রাশেদ জানান, ১৯ জুলাই নুরুল হক নুর (Nurul Haque Nur) গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার বাসায় দুই দফা অভিযান চালানো হয়। এরপর বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলন সফল করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক কর্মপন্থা নির্ধারণে তিনি কাজ করেছেন বলেও দাবি করেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সে সময় আন্দোলনের কাজে যুক্ত না থেকে তিনি গ্রেপ্তার হলে কি ‘নব্য বিপ্লবীরা’ বেশি খুশি হতেন? একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, আন্দোলনের সমন্বয়করাও আত্মগোপনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

রাশেদের দাবি, আন্দোলন যখন প্রায় থেমে যাওয়ার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, তখন নতুন করে আন্দোলন শুরু করার লক্ষ্যে ৩১ জুলাই বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও আইনজীবীরা হাইকোর্টের সামনে যে কর্মসূচিতে নেমেছিলেন, সেটিও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার পরামর্শের ভিত্তিতে ঠিক হয়েছিল। এরপর ৩ আগস্ট গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়েই তিনি শহীদ মিনারে যান এবং সমন্বয়কদের সঙ্গে কথা বলেন। একই সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন বলেও জানান। তার ভাষ্য, সে সময়ও তাকে গ্রেপ্তারের জন্য তন্নতন্ন করে খোঁজা হচ্ছিল।

টকশোর কথোপকথন নিয়েও নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী। তিনি বলেন, সারোয়ার তুষার তাকে প্রশ্ন করেছিলেন—প্রধানমন্ত্রী কোথায় ছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই বা কোথায় ছিলেন? জবাবে রাশেদ বলেন, তারা নির্বাসিত ছিলেন এবং সেখান থেকেই কাজ করেছেন।

এরপর তিনিও তুষারকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কোথায় ছিলেন?’ রাশেদের ভাষ্য অনুযায়ী, তুষার উত্তর দেন যে তিনি ১৯ জুলাই মাঠে ছিলেন। তখন রাশেদ জানতে চান, এর আগে ও পরে তিনি কোথায় ছিলেন। কিন্তু তার অভিযোগ, সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তুষার তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করতে থাকেন এবং ‘বেয়াদব’ ও ‘মিথ্যুক’ বলেন।

রাশেদ দাবি করেন, প্রথমবার এমন মন্তব্যের পর তিনি সারোয়ার তুষারকে কিছু বলেননি। তবে দ্বিতীয়বার আবারও তাকে ‘বেয়াদব’ বলা হলে তিনি পাল্টা জবাব দেন।

এ ঘটনার সূত্র ধরে ইমতিয়াজ মির্জার একটি পোস্টও তুলে ধরেন রাশেদ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইমতিয়াজ মির্জা লিখেছেন, ‘সারোয়ার তুষারকে ২০২৪ জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে আমাদের ProgressiveBAF group-এ যুক্ত করি। জুলাইয়ে আমাদের সব অ্যাক্টিভিটির হাব ছিল ProgressiveBAF, কারণ ইয়াং ক্রাউড ছিল, আর দ্রুত অ্যাকশন নেওয়া যেত। ঠিক আগস্টের ২-৩ তারিখে আওয়ামী লীগ গুজব ছড়িয়ে দেয়, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে যারা থাকবে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে। যেই শোনা সেই কাজ, সারোয়ার তুষারের মতো বিশাল বিশাল বিপ্লবীরা গ্রুপ থেকে চম্পট দেয়।’

ইমতিয়াজ মির্জার ওই পোস্টের মন্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৯ দফার ঘোষক আব্দুল কাদেরের বক্তব্যও উদ্ধৃত করেন রাশেদ। সেখানে আব্দুল কাদের লিখেছেন, ‘তুষার সাব এখন জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় ধ্বজাধারী! সবাইরে থোড়াই কেয়ার করে আর জ্ঞান দিয়ে বেড়ায়। কথায় কথায় মনীষীদের কোট করে, সেজন্য অনেক জ্ঞানী মনে হয়। অভ্যুত্থানের আগে কিংবা পরে, সরোয়ার তুষারকে আমি চিনতাম না ঐভাবে। কিছু মাস আগে হঠাৎ করে আলোচনায় আসার পরে চিনছি!’

পোস্টের শেষ অংশে রাশেদ খাঁন বলেন, তাকে কেউ ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করলে তিনি তার জবাব দেবেন। তার ভাষায়, ‘আমাকে কেউ ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করবে, আর আমি তাকে চুমু দিবো! এমন সুশীল ব্যক্তি আমি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা শব্দের রাজনীতি করতে চান, আবার এত চেতেন কেন? নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতির কথা বলে ভণ্ডবস্তের রাজনীতির সূচনা করেছেন।’ এই ধরনের রাজনীতি পরিহারের আহ্বান জানিয়ে রাশেদ বলেন, তা না হলে বাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘ইতরের সঙ্গে ভদ্রতা দেখানোর রাজনীতি’ কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।

তবে আচরণের বিপরীতে আচরণের কথাও স্পষ্ট করেন তিনি। রাশেদের ভাষায়, ‘ভদ্রতা আপনার পক্ষ থেকে আসলে, আমার পক্ষ থেকে আরও বেশি আসবে, ইনশাআল্লাহ।’