সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে চার হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায় নীল জলরাশির এক হ্রদ—মানস সরোবর। তার পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে কৈলাস পর্বত। বছরের বড় একটি সময় তুষার ও বরফে ঢাকা থাকে পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম এই অঞ্চল। তবু শত শত বছর ধরে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন এখানে। কেউ কৈলাস পর্বত প্রদক্ষিণ করেন, কেউ যান শুধু মানস সরোবরের তীরে।
কারও কাছে এই যাত্রার আকর্ষণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, তবে অধিকাংশ মানুষের উদ্দেশ্য ধর্মীয়। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং তিব্বতের প্রাচীন বন ধর্মের অনুসারীদের কাছে কৈলাস-মানস সরোবর একটি পবিত্র স্থান। অবশ্য চার ধর্মে এই পবিত্রতার ব্যাখ্যা এক নয়। কোথাও কৈলাস দেবতার আবাস, আবার কোথাও এটি আধ্যাত্মিক সাধনা ও ধর্মীয় অনুশীলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
এই অঞ্চলে যাওয়া তীর্থযাত্রীদের কেউই সাধারণত কৈলাসের চূড়ায় আরোহণ করেন না। বরং পর্বতটির চারপাশ ঘুরে প্রদক্ষিণ করেন। তিব্বতি ঐতিহ্যে এই প্রদক্ষিণকে বলা হয় ‘কোরা’। তবে কোন ধর্মের অনুসারী কীভাবে এই প্রদক্ষিণ করবেন, তার পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে।
অনেক তীর্থযাত্রী আবার মানস সরোবরের পানিকেও পবিত্র মনে করেন। বাংলায় পরিচিত ‘মানস সরোবর’ হ্রদটির নাম ইংরেজি ও স্থানীয় ভাষায় ‘মান সরোবর’ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
সম্প্রতি এই অঞ্চলে তীর্থযাত্রার সময় আকস্মিক বন্যায় অনেকে নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। এর ফলে আবারও আলোচনায় এসেছে দুর্গম এই তীর্থভূমি।
কিন্তু কৈলাস ও মানস সরোবর ঠিক কোথায়? চারটি ভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে একই অঞ্চল কীভাবে পবিত্র হয়ে উঠল? আর আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার যুগেও সেখানে পৌঁছানো কেন এত কঠিন?
কৈলাস ও মানস সরোবর কোথায়?
কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবর দুটিই তিব্বতে অবস্থিত। তিব্বত চীনের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। তবে ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চল নেপাল ও ভারতের সীমান্তেরও খুব কাছাকাছি।
কৈলাস পর্বতের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার বা ২১ হাজার ৭৭৮ ফুট। অর্থাৎ বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত এভারেস্টের চেয়ে কৈলাস দুই হাজার মিটারেরও বেশি নিচু।
কৈলাসের দক্ষিণে, খুব কাছেই রয়েছে মানস সরোবর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই স্বাদু পানির হ্রদটি এশিয়ার উচ্চতম স্বাদু পানির হ্রদগুলোর একটি।
চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মানস সরোবরের আয়তন প্রায় ৪১২ বর্গকিলোমিটার এবং গভীরতা প্রায় ৪৬ মিটার। হ্রদটিতে রয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি ঘনমিটার পানি। শীতকালে এই হ্রদের পানি জমে বরফ হয়ে যায়।
মানস সরোবরের পাশেই রয়েছে রাক্ষসতাল, যাকে লানাগ-তসো নামেও ডাকা হয়। মানস সরোবরের পানি স্বাদু হলেও রাক্ষসতালের পানি লবণাক্ত।
ইউনেস্কোর তথ্যে মানস সরোবর, রাক্ষসতাল ও কৈলাসকে একই বৃহত্তর ‘স্যাকরেড মাউন্টেনস অ্যান্ড লেকস’ অঞ্চলের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভৌগোলিক দিক থেকেও এই অঞ্চলটির গুরুত্ব অনেক। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার চারটি বড় নদীর উৎস এই অঞ্চল থেকেই। সিন্ধু, শতদ্রু, ব্রহ্মপুত্র ও কর্ণালী নদীর উৎপত্তির সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্ক রয়েছে।
তবে দুর্গম পাহাড় ও হ্রদঘেরা এই অঞ্চল শুধু ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত নয়। শত শত বছর ধরে কৈলাস ও মানস সরোবরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তীর্থযাত্রার ঐতিহ্য। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং বন ধর্মের অনুসারীদের কাছে অঞ্চলটির আলাদা আলাদা ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে।
চার ধর্মের কাছে কেন পবিত্র?
ইউনেস্কোর তথ্য বলছে, এই অঞ্চলে ধর্মীয় উপাসনার ইতিহাস প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো।
হিন্দু ধর্মে কৈলাসকে দেবতা শিব ও দেবী পার্বতীর আবাসস্থল হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। হিন্দু পুরাণ ও ধর্মীয় সাহিত্যেও কৈলাসের উল্লেখ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কুশল বরণ চক্রবর্তী বলেন, “শিব বৈদিকযুগ থেকেই উপাসিত। ঋগ্বেদ সংহিতার দশম মণ্ডলে কৈলাস পর্বতের স্বর্ণশিখরে বসবাসকারী দেবতা শিবের উল্লেখ আছে। হিন্দুদের পঞ্চমতের সবাই এটা বিশ্বাস করে। এদের মধ্যে শৈব ও শাক্ত কৈলাসকে পরম গন্তব্য হিসেবে মনে করে।”
ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলো—যেগুলো দেব-দেবী বা শক্তির প্রশংসা বর্ণনা করে রচিত পদ্য, শ্লোক বা স্তব—সাধারণভাবে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৫০০ থেকে ১২০০ সালের মধ্যে রচিত বলে ধরা হয়। অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় তিন হাজার ২০০ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে।
কৈলাস ও শিবের সম্পর্ক বোঝাতে কুশল বরণ চক্রবর্তী ঋগ্বেদ সংহিতার আশ্বলায়ন শাখার দুটি মন্ত্রের কথাও উল্লেখ করেন।
“কৈলাশশিখরাভাসং হিমবদ্ গিরিসংস্থিতম্।
নীলকন্ঠং ত্র্যক্ষং চ তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু।।
কৈলাশশিখরে রম্যে শঙ্করস্য শুভে গৃহে।
দেবতাস্তত্র মোদন্তি তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু।।”
এর অর্থ হলো—
“কৈলাশ পর্বতের স্বর্ণশিখরের মতো জ্যোতির্ময়, হিমগিরিতে সংস্থিত, নীলকণ্ঠ ত্রিনেত্র রূপ শিবে আমার মন সংযুক্ত হোক।
রমণীয় কৈলাশ পর্বতের শুভ গৃহে বা শিবের নিবাসে দেবতারা সদা আনন্দে বিরাজ করেন, সেই আমার মন শিবসঙ্কল্পময় বা শিবের সঙ্গে সংযুক্ত হোক।”
কুশল বরণ চক্রবর্তী বলেন, “মন্ত্রের মাঝেই কৈলাস শব্দটি আছে। ঋগ্বেদের যুগ থেকে যদি স্থানটি এতটা পবিত্র বিষয় হয়, তাহলে সেই পরম্পরাই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।”
মানস সরোবরও হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। তীর্থযাত্রীরা হ্রদের তীরে প্রার্থনা ও পূজা করেন এবং এর পানিকে পবিত্র মনে করে সংগ্রহ করেন।
ঐতিহ্যগতভাবে মানস সরোবরে স্নানেরও প্রচলন রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, এই হ্রদে স্নান করলে পাপ থেকে মুক্তি এবং আত্মিক শুদ্ধি লাভ করা যায়। তবে পরিবেশ দূষণ রোধে চীনা কর্তৃপক্ষ সরাসরি পানিতে নেমে স্নানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার সরকারি গাইডেও মানস সরোবরের ধর্মীয় আচার ও পবিত্রতা সম্পর্কে এই বিশ্বাসের উল্লেখ রয়েছে।
ইউনেস্কোর নথি অনুযায়ী, কৈলাস পর্বতের চারদিকে রয়েছে চারটি বড় গোম্পা বা বৌদ্ধ মঠ। আর মানস সরোবরের চারদিকে রয়েছে আটটি মঠ।
বৌদ্ধদের কাছেও কৈলাস অত্যন্ত পবিত্র। তিব্বতি ভাষায় পর্বতটি ‘কাং রিনপোচে’ নামে পরিচিত, যার অর্থ অনেকটা ‘তুষারের মূল্যবান রত্ন’।
হিমালয় অঞ্চলের শিল্প ও ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের রুবিন মিউজিয়াম অব হিমালয়ান আর্টের তথ্য অনুযায়ী, বৌদ্ধদের একটি অংশ বিশ্বাস করেন, কৈলাসই পৌরাণিক মেরু পর্বত বা মহাবিশ্বের কেন্দ্র।
ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টারে চীনের জমা দেওয়া নথিতেও বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে বিশিষ্ট বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা মানস সরোবরের তীরে সাধনা ও ধর্মীয় আচার পালন করেছেন।
বৌদ্ধদের কাছে কৈলাসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কুশল বরণ চক্রবর্তী বলেন, “ভুটান, চীন, তিব্বত, ভারতের সিকিম ও দার্জিলিং-এ, কাশ্মীরের লাদাখে, মঙ্গোলিয়ার মহাযানপন্থি বৌদ্ধরা বিভিন্ন দেব-দেবতার উপাসনা করে। বাংলায়ও পালযুগে মহাযানপন্থি বৌদ্ধরা ছিল। সেজন্য বাংলার জাদুঘরগুলোতে বৌদ্ধদের প্রচুর দেব-দেবতার মূর্তি আছে। যেমন—মারিচী, হিড়ম্ব, বজ্রস্বত্ব। মহাযানপন্থিদের কাছে ভৈরব খুব গুরুত্বপূর্ণ, শিবেরই একটা রূপ ভৈরব।”
বন ধর্মে কৈলাসের গুরুত্ব আরও পুরোনো তিব্বতি ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। বন ধর্মের অনুসারীদের কাছে কৈলাস তাদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র এবং উপাসনার অন্যতম পবিত্র স্থান।
কৈলাস-মানস সরোবর অঞ্চলকে ঘিরে বন ধর্ম ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধও ছিল। কথিত আছে, একাদশ শতকে মানস সরোবরের তীরে দুই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বড় ধরনের একটি প্রতিযোগিতা হয়েছিল। সেই প্রতিযোগিতায় তিব্বতি বৌদ্ধরা জয়ী হয়।
হিন্দু ও বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীরা সাধারণত ঘড়ির কাঁটার দিকে কৈলাস প্রদক্ষিণ করেন। হিন্দু ধর্মে এই প্রদক্ষিণকে বলা হয় পরিক্রমা। তিব্বতি বৌদ্ধ ঐতিহ্যে এর নাম ‘কোরা’। আবার কোনো কোনো তিব্বতি তীর্থযাত্রী পুরো পথ সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতে করতে সম্পন্ন করেন।
অন্যদিকে বন ও জৈন ধর্মের অনুসারীরা ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করেন—ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের পিথোরাগড় জেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটে এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
কৈলাস প্রদক্ষিণের পুরো পথ প্রায় ৫২ কিলোমিটার। এক দিনে পায়ে হেঁটে এই পথ পাড়ি দেওয়া সহজ নয়। সাধারণত তীর্থযাত্রীরা তিন দিনে পথটি শেষ করেন। পুরো যাত্রাপথে তাদের মোকাবিলা করতে হয় প্রচণ্ড ঠান্ডা, দ্রুত বদলে যাওয়া আবহাওয়া, ভূমিধস এবং দুর্গম পথসহ নানা প্রতিকূলতার।
জৈন ধর্মেও কৈলাসকে পবিত্র স্থান হিসেবে দেখা হয়। জৈনদের বিশ্বাস, তাদের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভদেব এই স্থানেই নির্বাণ লাভ করেছিলেন। ইউনেস্কোর নথিতেও এই বিশ্বাসের উল্লেখ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে কুশল বরণ চক্রবর্তী বলেন, “ভগবান ঋষভদেব যেমন জৈনদের আদি তীর্থঙ্কর, উনি সনাতন ধর্মে (ভাগবত পুরাণ) বিষ্ণুরও অবতার। আবার, ২৩-তম জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের যে শক্তি, তিনি হলেন পদ্মাবতী। এই পদ্মাবতীই হলেন মনসা। বাংলায় ঘরে ঘরে যার পূজা হয়।”
তার মতে, ভারতবর্ষে উৎপন্ন ধর্মগুলোকে একে অপরের থেকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখা কঠিন এবং অতীতে এই বিভাজনও এতটা স্পষ্ট ছিল না। সে কারণেই একই স্থান একাধিক ধর্মের অনুসারীদের কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা কঠিন কেন?
তীর্থযাত্রীরা কয়েকটি পথ ধরে কৈলাস-মানস সরোবরে যেতে পারেন।
বাংলাদেশিসহ অন্যান্য বিদেশি তীর্থযাত্রীরা সাধারণত নেপাল হয়ে তিব্বতে প্রবেশ করেন। এ ক্ষেত্রে তাদের চীনের ভিসার পাশাপাশি তিব্বতে ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নিতে হয়। একই সঙ্গে অনুমোদিত ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে পুরো যাত্রার ব্যবস্থা করতে হয়।
বিদেশিরা আবার চীনের ভেতর থেকে লাসা হয়েও কৈলাস-মানস সরোবরে যেতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রেও তিব্বতে ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ অনুমতিপত্র নিতে হয়।
বিবিসি সংবাদদাতা লরা বিকার জানিয়েছেন, তীর্থযাত্রীরা যে কৈলাস পর্বতের দিকে যান, সেখানে যাওয়ার জন্য বিশেষ অনুমতিপত্র প্রয়োজন। নেপালের দিক থেকেও হাজারো মানুষ তীর্থযাত্রায় যান, আর সেক্ষেত্রে একটি স্বীকৃত কোম্পানির মাধ্যমে চারটি ভিন্ন অনুমতিপত্র নিতে হয়।


