এর আগে জানুয়ারি মাসে পৌর শহরের পূর্ব হাজীপাড়ার সাদেকুল ইসলাম বসতবাড়ি বিক্রি করে পাওয়া পুরো অর্থ অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ে আ’\ত্মহত্যা করেন। এরও আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মহিশমারী গ্রামের আকরাম আলী অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব হয়ে মারা যান। ২০২৪ সালের মে মাসে একই উপজেলার রাজিউর রহমান রাজু মাত্র ছয় মাসে ২০ লাখ টাকার বেশি হারিয়ে আ’\ত্মহত্যা করেন।
অনলাইন জুয়ায় অর্থ হারিয়ে এক প্রতিবেশীকে নিঃস্ব হতে দেখেছেন আব্দুর জব্বার। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, শুরুতে কয়েকবার জিতিয়ে অনলাইন জুয়ার প্রতি মানুষের লোভ তৈরি করা হয়। এরপর যখন কেউ বড় অঙ্কের টাকা জুয়ায় লাগাতে শুরু করেন, তখন থেকেই হারানোর পালা শুরু হয়। অনেকে এই জুয়ার কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন, সংসারে দেখা দেয় অশান্তি। কেউ জমি বিক্রি করেন, আবার কেউ জীবনের সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
লোভনীয় ফাঁদের শুরু যেভাবে
সাইবার সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ফেসবুক, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারের গোপন গ্রুপ ব্যবহার করে স্থানীয় এজেন্টরা জুয়াড়ি সংগ্রহ করেন। শুরুতে অল্প টাকা দিয়ে কয়েকবার ‘জিতিয়ে’ তাদের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করা হয়। এরপর আরও বড় অঙ্কের অর্থ ঢালতে প্রলুব্ধ করা হয়।
একবার টাকা হারাতে শুরু করলে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার আশায় জুয়াড়িরা ধার-দেনা ও ঋণ করেন। কেউ কেউ এমনকি জমি-সম্পত্তি বিক্রি করেও জুয়ার নেশা থেকে বের হতে পারেন না। একসময় সব হারিয়ে ঋণ, পারিবারিক কলহ, মানসিক অবসাদ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে কয়েকজন জুয়াড়ি কিংবা স্থানীয় এজেন্ট গ্রেপ্তার হলেও মূল নিয়ন্ত্রকেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে প্রতিদিন নতুন করে মানুষ এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। একইসঙ্গে অব্যাহত রয়েছে লাখ লাখ থেকে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সারা দেশে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা থেকে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে। বিকাশ, নগদ, রকেট, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব এবং বিদেশভিত্তিক পেমেন্ট চ্যানেলের মাধ্যমে এসব অর্থ হাতবদল হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় এজেন্টরা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে মূল নেটওয়ার্কে পাঠিয়ে দেন। আর এসব অ্যাপ বিদেশি সার্ভারে পরিচালিত হওয়ায় মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলার সভাপতি আব্দুল লতিফ এশিয়া পোস্টকে বলেন, গত এক-দুই বছর ধরে ঠাকুরগাঁও জেলায় অনলাইন জুয়ার প্রবণতা বাড়ছে। কিছুদিন আগে একজনের আ’\ত্মহত্যার খবরও পেয়েছেন তিনি।
তাঁর মতে, প্রশাসনের পক্ষে একা এই অনলাইন জুয়া দমন করা সম্ভব নয়। অভিভাবকদের নিজেদের সন্তানের প্রতি নজর রাখতে হবে এবং অনলাইন জুয়ার খারাপ দিকগুলো তাদের বোঝাতে হবে। তাহলে হয়তো এই প্রবণতা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ে অনলাইন জুয়া নিয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনে চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া জুয়া প্রতিরোধ আইনে করা সাতটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও ১৫ জনকে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাজান খান বলেন, ঠাকুরগাঁও জেলায় অনলাইন জুয়া অনেক বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে অনলাইন জুয়ার কুফল সম্পর্কেও সচেতন করা হচ্ছে।
বদলে যায় চেনা মুখ
এশিয়া পোস্টের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, জুয়ার নেশায় ডুবে গিয়ে কীভাবে অনেকের স্বাভাবিক জীবন বদলে যায়। তাঁদেরই একজন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নাহিদ ইসলাম।
তিন বছর আগে, ২০২৩ সালে বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করেছিলেন নাহিদ। তাঁর ঘরে আসে একটি ছেলে সন্তান। বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ভালোই চলছিল তাঁর সংসার। কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে যেতে শুরু করেন তিনি।
স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাঁর পরিবর্তন লক্ষ্য করলেও এর কারণ বুঝে উঠতে পারছিলেন না। পরে জানা যায়, অনলাইনে জুয়া খেলে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার নেশাই তাঁকে প্রলুব্ধ করেছিল।
শুরুর দিকে কয়েকবার টাকা জেতায় তিনি আরও বেশি অর্থ জুয়ায় ঢালতে শুরু করেন। কিন্তু ‘ভাগ্য বদলের’ সেই নেশা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। একের পর এক টাকা হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। পরিবারের সদস্যদের কাছেও নিজের কষ্টের কথা প্রকাশ করতেন না।
শেষ পর্যন্ত হতাশা ও আর্থিক সংকটের কাছে হার মেনে দুই মাস আগে বিষপান করে আ’\ত্মহত্যা করেন নাহিদ। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সব স্বপ্ন মুহূর্তেই যেন ধুলোয় মিশে যায়।
নাহিদের মৃ’\ত্যুর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ছেলের কবরের পাশে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর মা নাজি বেগম। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, অনলাইন জুয়াই তাঁর ছেলেকে মেরে ফেলেছে। টাকা হারিয়ে নাহিদ মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু পরিবার বুঝতেই পারেনি, তিনি এত বড় বিপদের মধ্যে ছিলেন।
নাজি বেগম বলেন, সরকারের কাছে তাঁর একটাই অনুরোধ—অনলাইন জুয়া বন্ধ করে দেওয়া হোক। তাঁর ছেলের মতো কোনো মায়ের বুক যেন আর খালি না হয়। এখনও অনেক ছেলে অনলাইন জুয়া খেলছে বলেও জানান তিনি।
নাহিদের স্বজন খুশি মনি বলেন, নাহিদের এক বছরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। খুব সুখেই সংসার করছিলেন তিনি। কিন্তু অনলাইন জুয়া সেই সুখের সংসার শেষ করে দিয়েছে। এখন শিশুসন্তানকে নিয়ে নাহিদের স্ত্রী বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। একটি পরিবারের সব স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে।
প্রতিবেশী রুমি আক্তার বলেন, নাহিদ খুব শান্ত-ভদ্র ছেলে ছিলেন। কিন্তু অনলাইন জুয়ার নেশায় পড়ে তিনি একেবারে বদলে যান। তাঁর আশঙ্কা, আজ নাহিদ চলে গেছেন, কাল হয়তো তাঁদের পরিবারের কেউ এমন ফাঁদে পড়ে যেতে পারেন।
তাই সরকারের প্রতি তাঁর অনুরোধ, অনলাইন জুয়া বন্ধ করা হোক। আর যেন কোনো মাকে সন্তান হারাতে না হয়, কোনো স্ত্রীকে স্বামীহারা হতে না হয়।
মাদকের চেয়েও ভয়ানক
অভিভাবকদের ভাষ্য, আগে মাদক নিয়ে পরিবারগুলো যতটা উদ্বিগ্ন ছিল, এখন তার চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে অনলাইন জুয়া। কারণ এই নেশা ঘরের ভেতরেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চলছে। ফলে পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না, কখন তাঁদের সন্তান কিংবা স্বজন এই ভয়ানক ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছেন।
জেলা শহরের এক অভিভাবক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, সন্তান ঘরে বসে ফোন ব্যবহার করছে। কিন্তু সে পড়াশোনা করছে, নাকি অনলাইন জুয়া খেলছে—তা বোঝা খুব কঠিন। অধিকাংশ পরিবার এখন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।
ওয়াহিদ হোসেন বলেন, আজ অন্যের সন্তান মারা যাচ্ছে, কাল হয়তো তাঁর নিজের সন্তানও একই পথে যেতে পারে। সরকার এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পুরো যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। শুধু তরুণ নয়, এখন সব বয়সের মানুষই এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আরেক অভিভাবক মো. সোহাগ আলী বলেন, অনলাইন জুয়া শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না, পুরো একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। এই ভয়াবহ ব্যাধির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারের কঠোর অভিযান প্রয়োজন।
সার্বিক বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এই প্রবণতা পুরোপুরি প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
তাঁর মতে, পরিবারকে সন্তানদের ফোন ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকে একযোগে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে হবে। সবাই একসঙ্গে এগিয়ে এলে অনলাইন জুয়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

