ভারতে অবস্থানরত মৃ’\ত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার হুংকারকে কেন্দ্র করে প্রশাসনে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ষড়যন্ত্র করা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিশেষ করে ফ্যাসিস্ট শাসনামলে দিল্লিতে প্রশিক্ষণ নেওয়া কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড ও গতিবিধির ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চলছে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, হাসিনা সরকারের সময়ে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ও পদোন্নতিতে ভারতপন্থী কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। ২০১৪ সাল থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ২ হাজার ৬০০ কর্মকর্তাকে ভারতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে যারা এখনো সরকারি দায়িত্বে আছেন, তাদের একটি অংশ বর্তমানে সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব ও জেলা প্রশাসকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, দিল্লিতে প্রশিক্ষণ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা এখনো কর্মরত, তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশকে শর্ত হিসেবে রাখা উচিত নয়। এমন কোনো লিখিত বা অলিখিত নির্দেশনা থাকলে তা বাতিল করা প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।
২০১৯ সালে ভারত-বাংলাদেশ জয়েন্ট কনসালটেটিভ কমিশনের পঞ্চম বৈঠকের চুক্তির আওতায় ছয় বছরে ১ হাজার ৮০০ বাংলাদেশি কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে ভারত। ন্যাশনাল সেন্টার ফর গুড গভর্ন্যান্সের (এনসিজিজি) মাধ্যমে ই-গভর্ন্যান্স, সরকারি সেবা, জননীতি, তথ্যপ্রযুক্তি, বিকেন্দ্রীকরণ, নগর উন্নয়ন ও এসডিজি বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে এসব প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এনসিজিজি থেকে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের সংখ্যা ২ হাজার ১৪৫ জনে পৌঁছেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ভারতের ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমির মধ্যে ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত সমঝোতার আওতায় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের ভারতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে ২০২৫ সালে অধস্তন আদালতের ৫০ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার ভারতে যাওয়ার প্রজ্ঞাপন বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে ঢাকার অসন্তোষের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। একই সময়ে প্রশাসনে হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ ও ভারতপন্থী কর্মকর্তাদের একটি অংশ এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের কেউ সরকারি কর্মকাণ্ডে বাধা বা ষড়যন্ত্রে যুক্ত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশে সম্পর্ক জোরদারে দিল্লির তৎপরতাও বাড়ছে। ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের ভারতে প্রশিক্ষণে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। বৈঠকে ইসমাইল জবিউল্লাহ সীমান্তে হ’\ত্যা শূন্যে নামানো, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, অন্য দেশের কথামতো চলার দিন শেষ। বাংলাদেশ আর কারও অধীন হয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে না। তিনি ফেলানীর মতো আর কোনো বাংলাদেশির লাশ কাঁটাতারে ঝুলতে দেখতে চান না এবং গঙ্গা ও তিস্তা সংকট সমাধানে সরকারের শক্ত অবস্থান দাবি করেন।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থায় ভারতপন্থী ও হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারা এখনো রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের হাতে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা থাকা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
