অভিযোগ, বর্জন আর বিতর্কের ছায়ায় শেষ—বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনে বিএনপির জয়

নানা অভিযোগ, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং এক পর্যায়ে নির্বাচন বর্জনের নাটকীয় ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসনের ভোটগ্রহণ। বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩—দুই ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। বগুড়ায় রেজাউল করিম বাদশা এবং শেরপুরে মাহমুদুল হক রুবেলের বিজয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।

শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে দিনভর ভোটগ্রহণ ঘিরে শুরুটা ছিল বেশ শান্তিপূর্ণ। সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোয় ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল, বিশেষ করে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগের সুর চড়া হতে থাকে। বেলা ১১টার দিকে শ্রীবরদীর লংপাড়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগে ছয় যুবককে আটক করা হয়। একই ধরনের অভিযোগে আরও দুজনকে আটক করা হয় অন্য একটি কেন্দ্রে। এর মধ্যেই শ্রীবরদী সরকারি কলেজ মাঠ এলাকায় শৃঙ্খলা রক্ষায় গিয়ে ইটপাটকেলের আঘাতে দুই পুলিশ সদস্য আহত হন।

এরপর পরিস্থিতি মোড় নেয় নাটকীয় দিকে। জামায়াতের প্রার্থী মো. মাসুদুর রহমান দুপুরের পর সংবাদ সম্মেলনে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কেন্দ্রে জালভোট, প্রকাশ্যে সিল মারা এবং তার এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি পূর্বে অভিযোগ জানানোর পরও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তার ভাষ্য, কোনো কেন্দ্রেই অনিয়মের ঘটনা ঘটেনি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নজিরবিহীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। তিনি দাবি করেন, নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরেই জামায়াত পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বর্জন করেছে।

রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, নির্বাচন বর্জনের বিষয়ে তাদের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি।

উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি এই আসনে ভোট হওয়ার কথা থাকলেও জামায়াত প্রার্থী মু. নুরুজ্জামান বাদল মারা যাওয়ায় নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত ফলাফলে দেখা যায়, শেরপুর-৩ আসনে এক লাখ ১৮ হাজার ৯৬৬ ভোটের ব্যবধানে জয় পান রুবেল। তিনি মোট এক লাখ ৬৬ হাজার ১১৭ ভোট পান, যেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাসুদুর রহমান পান ৪৭ হাজার ৫১ ভোট।

অন্যদিকে বগুড়া-৬ (সদর) আসনেও ফলাফল ঘোষণার পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিএনপির একতরফা আধিপত্য। এখানে বিএনপি প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশা এক লাখ ৩৩ হাজার ৫১৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী আবিদুর রহমান সোহেল পান ৫৬ হাজার ৯৪ ভোট। বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়ে বাদশা বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন।

যদিও এই আসনেও কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠে। বিশেষ করে একটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলাকালে ফলাফল শিটে আগাম স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনা তোলপাড় সৃষ্টি করে। অভিযোগ ওঠে, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ভোট শেষে গণনা না করেই আগে থেকেই স্বাক্ষর নিচ্ছিলেন। পরে অভিযুক্ত কর্মকর্তা নূর ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, কাজের চাপ কমাতে তিনি এমনটি করেছিলেন।

এ ঘটনায় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তাসওয়ার তানজামুল হক তাকে সতর্ক করেন। নির্বাচন কর্মকর্তারা অবশ্য এটিকে অপরাধ নয়, বরং ভুল হিসেবে দেখেছেন।

উল্লেখযোগ্যভাবে, গত জাতীয় নির্বাচনে এই আসন থেকে বিজয়ী তারেক রহমান (Tarique Rahman) দুটি আসনে জয় পাওয়ায় বগুড়া-৬ আসনটি শূন্য হয় এবং পরবর্তীতে উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয়।

সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলেও অভিযোগ ও বর্জনের ঘটনাগুলো ভবিষ্যতের জন্য প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।