ভৈরবে ট্রেনের নিচে বাবার বুকের ঢাল—অলৌকিকভাবে বেঁচে গেল ২ বছরের শিশু

কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে ঘটে গেল এক রুদ্ধশ্বাস ও হৃদয়বিদারক ঘটনা, যা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নিজের দুই বছরের সন্তানকে বাঁচাতে এক বাবা রেললাইনের ওপর শুয়ে ট্রেনের নিচে নিজেকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন—এবং অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তিনি ও তার শিশু সন্তান।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে ভৈরব স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে এই ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মুহূর্তের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো স্টেশনজুড়ে আতঙ্ক ও স্তব্ধতা নেমে আসে।

কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুড়ি গ্রাম থেকে আসা এক দম্পতি তাদের দুই বছরের শিশুসন্তানকে নিয়ে ঢাকাগামী ট্রেন ধরতে ভৈরব স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। আখাউড়া থেকে ছেড়ে আসা তিতাস কমিউটার ট্রেনটি প্রায় এক ঘণ্টা বিলম্বে স্টেশনে পৌঁছায়।

ট্রেন থামার পর যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে কামরায় উঠতে শুরু করেন। সেই ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে মা ও শিশু সন্তান ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মাঝের সরু ফাঁকা জায়গায় পড়ে যান। মা কোনোভাবে দ্রুত উঠে আসতে সক্ষম হলেও কোলের শিশুটি নিচে আটকে পড়ে।

জীবন বাঁচাতে বাবার সাহসী ঝাঁপ
ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেন ছাড়ার বাঁশি বেজে ওঠে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে শিশুকে বাঁচাতে আর সময় নষ্ট না করে বাবা নিচে লাফ দেন। মুহূর্তের মধ্যে তিনি শিশুটিকে নিজের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে রেললাইনের পাশে শুয়ে পড়েন।

চলন্ত ট্রেনের একের পর এক কামরা যখন তাদের ওপর দিয়ে অতিক্রম করছিল, তখন প্ল্যাটফর্মে থাকা যাত্রীরা আতঙ্কে নিস্তব্ধ হয়ে যান। কেউ কেউ “আল্লাহ আল্লাহ” বলে প্রার্থনা করতে থাকেন।

অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা
ট্রেনটি স্টেশন পার হওয়ার পর দেখা যায়, বাবা ও শিশু দুজনই অক্ষত অবস্থায় রেললাইনের পাশে শুয়ে আছেন। দ্রুত উপস্থিত লোকজন তাদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য
তিতাস ট্রেনের টিকিট বিক্রেতা ফালু মিয়া জানান, বাবার সামান্য নড়াচড়াও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারত। তার মতে, ওই বাবার অসীম সাহস ও সন্তানকে বাঁচানোর দৃঢ়তা উপস্থিত সবাইকে বাকরুদ্ধ করে দেয়।

স্টেশন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. ইউসুফ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ট্রেনটি বিলম্বে আসায় প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত ভিড় ছিল। সেই ভিড়ের চাপেই এই দুর্ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পর দম্পতিকে ভৈরব রেলওয়ে থানা পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ জানান, তাদের শরীরে গুরুতর কোনো আঘাত নেই। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও আতঙ্কের কারণে তারা গ্রামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

কটিয়াদীর লোহাজুড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা ওই দম্পতির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এক বাবার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে রইল সবার মনে।