সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin) নিজের চলাফেরা ও কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছেন বলে উঠে এসেছে এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ডিসেম্বরে এক শীর্ষ জেনারেলের হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে পুতিনের নিয়মিত যাতায়াতের স্থান কমিয়ে আনা হয়েছে, এমনকি তিনি গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনের পরিচিত কেন্দ্র ভালদাই (Valdai)-তে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তিনি নিয়মিত সফরে থাকলেও ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত কোনো সামরিক স্থাপনা পরিদর্শন করেননি। ২০২২ সালে ইউক্রেন (Ukraine) আক্রমণের পর থেকে তিনি দীর্ঘ সময় উন্নতমানের বাঙ্কারে অবস্থান করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাশিয়ার প্রধান শহরগুলোতে নিয়মিত মোবাইল ফোন ডেটা বিভ্রাট ঘটছে, যা এমনকি পুতিনপন্থি শহুরে অভিজাতদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি করছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধের প্রভাব এখন আর সীমাবদ্ধ নেই—বরং তা ছড়িয়ে পড়ছে সমাজের উচ্চস্তরেও। একইসঙ্গে মস্কো (Moscow)-র অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
অভ্যুত্থানের আশঙ্কা ঘিরে সতর্কতা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের মার্চের শুরু থেকে ক্রেমলিনে সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস, ষড়যন্ত্র কিংবা সম্ভাব্য অভ্যুত্থান নিয়ে আশঙ্কা বেড়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অভিজাতদের পক্ষ থেকে ড্রোন ব্যবহার করে গুপ্তহত্যার সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আলোচনায় উঠে এসেছে পুতিনের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সের্গেই শোইগু (Sergei Shoigu)-এর নাম। বর্তমানে তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হিসেবে দায়িত্বে থাকলেও, সামরিক উচ্চপর্যায়ে তার প্রভাব এখনও দৃশ্যমান। তাকে নিয়েও ক্রেমলিনের ভেতরে সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ৫ মার্চ তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী রুসলান সালিকভের গ্রেপ্তারকে ‘অভিজাতদের মধ্যেকার অলিখিত সুরক্ষা চুক্তির লঙ্ঘন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৩ সালের জুনে একটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিলেন পুতিন। ক্রেমলিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সাধারণত গোপন থাকলেও, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তা আরও প্রকট হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সমর্থন কমে আসার প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছেও এই অস্থিরতার ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে।
নিরাপত্তা বলয় আরও কঠোর
পুতিনকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগেও কঠোর ছিল, তবে এখন তা আরও জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক দেহ তল্লাশি, ক্রেমলিনে স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং প্রেসিডেন্টের চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ। যদিও এসবের মধ্যেও তিনি জনসমক্ষে উপস্থিত হচ্ছেন—সম্প্রতি চেচেন নেতা রমজান কাদিরভ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে।
ক্রেমলিনের ভেতরে উত্তপ্ত পরিবেশ
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত বছরের শেষ দিকে ক্রেমলিনে পুতিনের সঙ্গে শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ঘটে। ওই বৈঠকে চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ ভ্যালেরি গেরাসিমভ, ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের প্রধান আলেকজান্ডার বর্টনিকভের সমালোচনা করেন কর্মকর্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পুতিন বৈঠকে উপস্থিত সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সমস্যার কার্যকর সমাধান দেওয়ার নির্দেশ দেন। দ্রুত পদক্ষেপ হিসেবে তিনি ফেডারেল প্রোটেকশন সার্ভিসের (এফএসও) কার্যপরিধি আরও বিস্তৃত করেছেন।
খবরটি প্রকাশ করেছে সিএনএন (CNN)।


