জুলাইয়ের সেই দিনগুলোর স্মৃতি যেন সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়নি, বরং আরও গভীর হয়েছে। একটি সাধারণ পরিবারের স্বপ্ন, হাসি আর স্বাভাবিক জীবনের ভেতর হঠাৎ নেমে আসা অমানবিকতার গল্প আজও তাড়া করে ফেরে। শহীদ নাইমার বাড়িতে গিয়ে যে অনুভূতি, যে দায়বদ্ধতা আর যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে—তা কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং একটি জাতির বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো বাস্তবতা।
শপথ নেওয়ার পর প্রথমেই জুলাইয়ের শহীদ নাইমার বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হবে, তা কল্পনারও বাইরে ছিল। নাইমার মা তাকে দেখে এতটাই আনন্দিত হয়েছিলেন যে তা তাকে বিস্মিত করে। বয়সের দিক থেকে নাইমা তার নিজের মেয়ের কাছাকাছি, আর তার মা প্রায় সমবয়সী—এই মিল যেন সম্পর্কটাকে আরও গভীর করে তোলে।
কিন্তু সেই ঘরে ঢোকার পরই শপথের ভার যেন নতুন করে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। মনে হয়, দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক নয়—এটি এক গভীর মানবিক দায়ও।
নাইমার মা জানালেন, মেয়েটি সেদিন পিজ্জা বানাবে বলে চিকেন নামিয়ে বারান্দায় গিয়েছিল। আর সেখানেই তাকে খু’\ন করা হয়। একটি নিরীহ মুহূর্ত, একটি সাধারণ দিনের পরিকল্পনা—হঠাৎ করেই থেমে যায় নির্মম বাস্তবতায়।
তার বক্তব্যে উঠে আসে রাষ্ট্র কাঠামোর কঠোর সমালোচনা। তিনি বলেন, ৭২ সালের সংবিধান এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছে যেখানে ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। সেই কাঠামোর সুযোগ নিয়ে পুলিশ, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা—সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে নিরস্ত্র শিশুদের বুক-মাথায় গু’\লি চালানো হয়েছে।
এই কাঠামোকে তিনি ফ্যাসিবাদ তৈরির যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, দেশ সংস্কারের কথা বলা হলেও বাস্তবে এখনো সেই পুরনো ব্যবস্থার গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া যায়নি।
নাইমার মায়ের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তার কোনো চাওয়া আছে কি না। তিনি খুব স্পষ্টভাবে দুটি দাবি তুলে ধরেন—জুলাইয়ের হ’\ত্যাকাণ্ডের বিচার এবং দেশের প্রকৃত সংস্কার। পাশাপাশি তিনি হাদি হ’\ত্যার বিচারও চান।
তার ভয়ও স্পষ্ট—তার আরও দুই সন্তান রয়েছে। যদি সংস্কার না হয়, যদি দেশ আবার সেই পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যায়, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে?
তার কথায় উঠে আসে এক গভীর আশঙ্কা—সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে দেশ আবার ফিরে যাবে সেই একই রাজনীতি, একই সিস্টেম, একই সিন্ডিকেটের কাছে।
কথা বলতে বলতে তিনি কেঁদে ফেলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় না। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সেই সংবিধান দিয়ে, যে সংবিধান তার সন্তানের জীবন কেড়ে নিয়েছে—বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা এক নিরীহ মেয়েকে খু’\ন করেছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বানও উঠে আসে—দেশের ৩৫০ জন এমপি ও মন্ত্রীদের মাসে অন্তত একবার এসব মায়েদের কাছে গিয়ে কিছু সময় কাটানো উচিত। তাহলে হয়তো তারা বুঝতে পারবেন, কেন তারা সেই সবুজ চেয়ারে বসেছেন, কী দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পিত হয়েছে।
অনেক দিন পর আবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য—বারান্দায় পড়ে থাকা গু’\লি’\বি’\দ্ধ নাইমাকে কিছু ছাত্র ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সেই দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির জন্য এক গভীর লজ্জা ও বেদনার প্রতীক।
