টানা এক সপ্তাহ লোডশেডিংহীন দেশ: উৎপাদন ও বৃষ্টির প্রভাবে স্বস্তিতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি

দেশে টানা এক সপ্তাহ ধরে কোনো লোডশেডিং হয়নি—এমন তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতির বিশ্লেষণে। গত ২৭ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত সময়ের পর্যালোচনায় দেখা যায়, চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত উৎপাদন থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো ঘাটতি তৈরি হয়নি।

বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টি ও ভারি বর্ষণের কারণে কৃষিখাতে সেচের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। এতে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতির ফলে এখন লোডশেডিং প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (Bangladesh Power Development Board – PDB) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম (Md. Rezaul Karim) বলেন, “আগের তুলনায় এখন আমরা চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছি। ছোট কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রে সমস্যার কারণে আগে উৎপাদনে ঘাটতি ছিল, তবে বর্তমানে সেই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা গেছে।” তিনি জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী সামনের দিনগুলোতেও শূন্য লোডশেডিং বজায় রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

উৎপাদন টেকসই রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। রেজাউল করিম বলেন, কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন মূল লক্ষ্য, কারণ তেল ও গ্যাস সীমিত হওয়ায় সেগুলোকে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবহার করতে হয়। বর্তমানে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে। পটুয়াখালীর আরএনপিএল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে এবং আরেকটি শিগগিরই চালু হওয়ার অপেক্ষায়।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (Power Grid Bangladesh PLC – PGCB) এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যার পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৭৯৩ মেগাওয়াট এবং ঠিক সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে ওইদিন কোনো লোডশেডিং হয়নি।

পরবর্তী দিনগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২৮, ২৯ ও ৩০ এপ্রিল যথাক্রমে ১১ হাজার ৪৭৫, ১১ হাজার ৩৬ এবং ১২ হাজার ৬১৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পুরো সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। মে মাসের শুরুতেও এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে—১, ২ ও ৩ মে চাহিদা ছিল যথাক্রমে ১০ হাজার ৪৬২, ১১ হাজার ৯২ এবং ১২ হাজার ৭৪৫ মেগাওয়াট, যা সম্পূর্ণরূপে পূরণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপও এই ইতিবাচক অবস্থার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা, বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং এয়ার কন্ডিশনার ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রায় ব্যবহারের নির্দেশনা এ ক্ষেত্রে কার্যকর হয়েছে।

পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), হেভি ফুয়েল অয়েল (এইচএফও) ও কয়লা আমদানির উদ্যোগ নেওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখা সম্ভব হয়েছে। ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ আমদানি অব্যাহত থাকা এবং পটুয়াখালীর আরএনপিএল কেন্দ্র উৎপাদনে যুক্ত হওয়াও পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।

এছাড়া গণমাধ্যম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সচেতনতা কার্যক্রমও চালানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ব্যবহারে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে ঢাকায় কোথাও লোডশেডিং দেখা যায়নি। দিনে কিংবা সন্ধ্যায় কোনো সময়েই বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়নি। আগে যেখানে দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ যেত, এখন তা প্রায় নেই বললেই চলে। এতে বাসাবাড়ির স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তবে জাতীয়ভাবে লোডশেডিং না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিতোষ সূত্রধর (Paritosh Sutrodhar), যিনি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের পরিচালক (কারিগরি)। তিনি বলেন, গাছ কাটা, লাইন রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা কারিগরি ত্রুটির কারণে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হতে পারে। গ্রামাঞ্চলে কখনো তারের ওপর বাঁশ পড়ে যাওয়া বা স্পার্কিংয়ের মতো ঘটনায়ও স্বল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিতে পারে। তবে এসব ঘটনাকে লোডশেডিং হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

সূত্র: বাসস