এক দশকে ব্ল্যাকপিংক: চার তারকার আলাদা পথ, এক নামের অমলিন বন্ধন

দশ বছর আগে চার তরুণীর হাত ধরে শুরু হয়েছিল যে স্বপ্নযাত্রা, সময়ের সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। কোটি ভক্তের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া জিসু, জেনি, রোজে ও লিসাকে নিয়ে গড়া ব্ল্যাকপিংক এখন আর কেবল একটি কে-পপ গার্ল গ্রুপের নাম নয়; পপ সংগীতের জগতে এটি পরিণত হয়েছে এক শক্তিশালী বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে।

২০১৬ সালের আগস্টে ‘হুইসেল’ ও ‘বুমবায়াহ’ দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল দলটি। দেখতে দেখতে সেই যাত্রা পূর্ণ করেছে এক দশক। এই সময়ে সংগীতের পাশাপাশি মঞ্চ, ফ্যাশন এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে নিজেদের জন্য আলাদা একটি অবস্থান তৈরি করেছে ব্ল্যাকপিংক।

আত্মপ্রকাশের পর থেকেই একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে চার সদস্যের এই দল। ‘ডিডু-ডু ডিডু-ডু’, ‘কিল দিস লাভ’, ‘হাউ ইউ লাইক দ্যাট’, ‘লাভসিক গার্লস’ এবং ‘পিঙ্ক ভেনম’-এর মতো গান বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। শুধু গান নয়, তাদের মিউজিক ভিডিও, স্টেজ পারফরম্যান্স এবং ফ্যাশন স্টাইলও বারবার আলোচনায় এসেছে। চার সদস্যের আলাদা ব্যক্তিত্ব ও নিজস্ব উপস্থিতি যেন দলটির সামগ্রিক আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সাফল্যের মুকুটে একের পর এক পালক

২০২২ সালে প্রকাশিত ‘বর্ন পিংক’ অ্যালবাম ব্ল্যাকপিংকের ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলক হয়ে ওঠে। অ্যালবামটি বিলবোর্ডের সেরা ২০০-এর শীর্ষস্থান দখল করে ইতিহাস গড়ে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের অফিসিয়াল অ্যালবাম তালিকাতেও শীর্ষস্থান অর্জন করে এটি।

এরপর দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালে দলীয় প্রকল্প হিসেবে আসে তৃতীয় ইপি ‘ডেডলাইন’। তিন বছরেরও বেশি সময় পর চার সদস্যকে আবার একসঙ্গে দেখার সুযোগ পাওয়ায় ভক্তদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বিশেষ উচ্ছ্বাস। অ্যালবামটিও সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে বিলবোর্ড ২০০-তে আট নম্বর অবস্থান করে নেয়।

তবে ব্ল্যাকপিংকের সাফল্যের গল্প শুধু সংগীতেই আটকে থাকেনি। ফ্যাশন এবং বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের সঙ্গেও চার সদস্য নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে পরিচিত মুখে পরিণত হয়েছেন। ফলে ‘ব্ল্যাকপিংক’ নামটি ধীরে ধীরে একটি সংগীত দলের পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে রূপ নিয়েছে।

চারজনের চার পথ, বন্ধন সেই এক

২০২৩ সালের শেষ দিকে ব্ল্যাকপিংকের পথচলায় শুরু হয় নতুন একটি অধ্যায়। দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য ওয়াইজি এন্টারটেইনমেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলেও ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে চার সদস্য আলাদা পথ বেছে নেন।

জেনি শুরু করেন নিজের প্রতিষ্ঠান অড অ্যাটেলিয়ার। লিসা গড়ে তোলেন লাউড। জিসু শুরু করেন ব্লিসু। আর রোজে যুক্ত হন দ্য ব্ল্যাক লেবেলের সঙ্গে। এরপর তাঁদের একক ক্যারিয়ারও নিজ নিজ গতিতে এগিয়ে যায়।

রোজে ব্রুনো মার্সের সঙ্গে ‘এপিটি.’ গান দিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেন। গানটির জন্য ২০২৫ সালের এমটিভি ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসে ‘সং অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারও জেতেন তিনি। জেনি নিজের প্রথম একক অ্যালবাম ‘রুবি’ প্রকাশের মাধ্যমে শিল্পী হিসেবে নিজের পরিসর আরও বিস্তৃত করেন।

অন্যদিকে সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়ের দিকেও মনোযোগ দিয়েছেন জিসু। লিসাও সংগীতের বাইরে অভিনয়ের জগতে পা রাখেন ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’-এর মাধ্যমে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও পারফর্ম করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের উপস্থিতি জানান দেন তিনি।

এখন চার তারকার পথ অনেকটাই আলাদা। কেউ সংগীতে, কেউ অভিনয়ে, আবার কেউ ব্যবসা ও ফ্যাশনের মাধ্যমে নিজের পরিচয় আরও বিস্তৃত করছেন। প্রত্যেকে নিজস্ব ক্ষেত্রে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। কিন্তু চারজন যখন আবার একসঙ্গে মঞ্চে ওঠেন, তখন সেই পুরোনো নামটিই ফিরে আসে—ব্ল্যাকপিংক।

এক দশকের এই পথচলা তাই কেবল চার তারকার জনপ্রিয়তার গল্প নয়। এটি স্বপ্ন দেখা, পরিশ্রম করা, সাফল্য অর্জন এবং সময়ের সঙ্গে নিজেদের পরিচয়কে নতুন করে নির্মাণ করার গল্পও। ২০১৬ সালের সেই দুই গান দিয়ে যে যাত্রার শুরু, এক দশক পর সেটিই চার তারকার চারটি আলাদা গল্পকে একই সুতোয় বেঁধে রাখা দীর্ঘ এক সংগীতযাত্রার প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে।