মাত্র তিনজন শ্রোতার সামনে এক ঘণ্টা গান গেয়ে এক মিলিয়ন ডলার পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন মার্কিন সংগীতশিল্পী একন (Akon)। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১২ কোটি টাকারও বেশি। ক্যারিয়ারের এই ব্যতিক্রমী ও অদ্ভুত কনসার্টের অভিজ্ঞতা সম্প্রতি ‘ফ্ল্যাগর্যান্ট’ (Flagrant) পডকাস্টে তুলে ধরেছেন জনপ্রিয় এই শিল্পী।
ঘটনাটি ঘটেছিল মধ্যপ্রাচ্যের (Middle East) একটি ধনী পরিবারের ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে। পরিবারের এক মেয়ে একনের ভীষণ ভক্ত ছিলেন। মূলত তার আবদারেই আয়োজন করা হয়েছিল সেই কনসার্ট। তবে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি ও আয়োজনের ব্যাপকতা দেখে একনের ধারণা হয়েছিল, সেখানে নিশ্চয়ই বিপুলসংখ্যক দর্শক-শ্রোতা উপস্থিত থাকবেন।
কনসার্টে একা যাননি একন। তার সঙ্গে ছিল পুরো ট্যুরিং দল। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার, লাইটিং টিম, রোড ম্যানেজার ও বিজনেস ম্যানেজারসহ দলের সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই রাখা হয়েছিল। এমন প্রস্তুতির পরও শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটির দর্শক-শ্রোতার সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র তিনজন।
একন জানান, ওই পরিবারের মেয়েটির বিশেষ অনুরোধে তাকে পুরো এক ঘণ্টা নিজের জনপ্রিয় গান ‘মিস্টার লোনলি’ বারবার গাইতে হয়েছিল। বিপুল আয়োজনের বিপরীতে মাত্র তিনজন মানুষের সামনে একই গান ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে গাওয়ার সেই অভিজ্ঞতাকে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম অদ্ভুত কনসার্ট হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি।
অনুষ্ঠানে পৌঁছানোর ব্যবস্থাটিও ছিল রাজকীয়। একনের জন্য পাঠানো হয়েছিল বিশেষ একটি ৭৪৭ উড়োজাহাজ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই উড়োজাহাজে ছিল শোবার ঘর, শাওয়ার, গেম রুম ও থিয়েটার। এমন আয়োজন দেখে স্বাভাবিকভাবেই তিনি ধরে নিয়েছিলেন, সামনে অপেক্ষা করছে বিশাল কোনো কনসার্ট এবং সেখানে থাকবেন অসংখ্য দর্শক।
কিন্তু অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে মঞ্চের চিত্র দেখার পরই তার সেই ধারণা বদলে যায়।
একনকে নিয়ে যাওয়া হয় বিশাল একটি হলের মধ্য দিয়ে। সেখানে ছিল বড় মঞ্চ, এলইডি লাইট, লেজারসহ কনসার্টের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের আয়োজন। অথচ দর্শকদের বসার জন্য রাখা হয়েছিল মাত্র তিনটি চেয়ার।
সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে একন বলেন, ‘তারা আমাকে বিশাল একটি হলের মধ্য দিয়ে নিয়ে গেল। সেখানে ছিল শুধু তিনটি চেয়ার, বিশাল মঞ্চ, এলইডি লাইট, লেজার এবং সবকিছু। আমি মঞ্চের পাশে বসে আমার দর্শকদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।’
কিছুক্ষণ পর সেখানে উপস্থিত হন পরিবারের তিন সদস্য—এক মেয়ে, এক ছেলে ও তাদের মা। একনের ভাষায়, মেয়েটি তার ভক্ত হওয়ায় তাকে সামনে পেয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনজন দর্শককে সামনে রেখেই এরপর নিজের নির্ধারিত পরিবেশনা শুরু করেন একন।
তবে কনসার্টের মাঝপথেই ঘটে আরেক ঘটনা। মেয়েটি হঠাৎ একনকে থামিয়ে দেন। একন প্রথমে জানতে চান, সবকিছু ঠিক আছে কি না। তখন মেয়েটি জানায়, সে একনের জনপ্রিয় গান ‘মিস্টার লোনলি’ শুনতে চায়।
সেই কথোপকথন স্মরণ করে একন বলেন, ‘সে বলল, “আমি ‘মিস্টার লোনলি’ শুনতে চাই।” আমি বললাম, “এটাই?” সে বলল, “হ্যাঁ, আগে এটা গাইতে পারেন?”’
অনুরোধ অনুযায়ী ‘মিস্টার লোনলি’ গেয়ে শোনান একন। কিন্তু গানটি শেষ হওয়ার পর মেয়েটি আবারও একই গান শুনতে চায়। দ্বিতীয়বার শেষ হওয়ার পরও আসে একই অনুরোধ। একনের ভাষ্য, এভাবে পুরো এক ঘণ্টা ধরে তাকে কেবল ‘মিস্টার লোনলি’ গানটিই বারবার গাইতে হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘গান শেষ হলো, আর সে বলল, “আহা, আবার!” পুরো এক ঘণ্টা। আমরা শুধু সেটাই গেয়েছি।’
অদ্ভুত সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে একন মজা করে জানান, তাকে যেন অনেকটা সিডি প্লেয়ারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছিল। তার সঙ্গে থাকা পুরো ট্যুরিং দল, সাউন্ড ও লাইটিংয়ের কর্মীরাও শুরুতে ভেবেছিলেন, এটি বিশাল কোনো কনসার্ট হতে যাচ্ছে। অথচ শেষ পর্যন্ত বিশাল মঞ্চ আর বিপুল প্রস্তুতির সামনে দর্শক ছিলেন তিনজন, আর একনকে একই গানই গাইতে হয়েছে বারবার।
শুধু নিজের পারিশ্রমিক নয়, পুরো আয়োজনের বিপুল খরচের কথাও পডকাস্টে জানিয়েছেন একন। তার হিসাবে, তার পারিশ্রমিক এবং মঞ্চসহ পুরো অনুষ্ঠানের আয়োজন মিলিয়ে আনুমানিক ৫০ লাখ ডলার খরচ হয়েছিল।
পরে সেই আয়োজনের কথা স্মরণ করে রসিকতাও করেন একন। তার মনে হয়েছিল, অনুষ্ঠানের ধরন সম্পর্কে আগে থেকেই যদি তাকে বিস্তারিত জানানো হতো, তাহলে এত বড় আয়োজনের প্রয়োজনই পড়ত না। বরং অনেক কম খরচে একই কাজ করা সম্ভব ছিল।
একন বলেন, ‘আমি মনে মনে ভাবছিলাম, তারা যদি আগে আমাকে সবকিছু বলে দিত, আমি তাদের এত টাকা বাঁচিয়ে দিতে পারতাম। অর্ধেক টাকা নিয়েই তাদের বসার ঘরে গিয়ে এক ঘণ্টা কারাওকে করতে পারতাম।’
একনের এমন মন্তব্য শুনে পডকাস্টে উপস্থিত সবাই হাসতে থাকেন।
২০০৪ সালে প্রথম অ্যালবাম ‘ট্রাবল’ প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে পরিচিতি পান সেনেগালিজ-আমেরিকান সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও প্রযোজক একন। ওই অ্যালবামের ‘লকড আপ’ ও ‘লোনলি’ গান তাকে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
পরবর্তী সময়ে ‘স্ম্যাক দ্যাট’, ‘আই ওয়ানা লাভ ইউ’, ‘ডোন্ট ম্যাটার’, ‘বিউটিফুল’ ও ‘রাইট নাউ (না না না)’–সহ একাধিক জনপ্রিয় গান উপহার দেন তিনি। সংগীতশিল্পী হিসেবে সাফল্যের পাশাপাশি প্রযোজক ও উদ্যোক্তা হিসেবেও কাজ করেছেন একন।


